ঢাকা , ১৫ ২০১৯ ,

উত্তরায় তরুণ-তরুণী ধরার ভয়ংকর ফাঁদ, ৮ প্রতারক গ্রেপ্তার

বায়ান্ন অনলাইন রিপোর্ট | ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২:৩৫ অপরাহ্ন | আপডেট : ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২:৫৪ অপরাহ্ন
feature-top

রাজধানীর উত্তরায় লাইফওয়ে নামে একটি ভুয়া কোম্পানি বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তরুণ-তরুণীদের চাকরি দেয়ার কথা বলে ঢাকায় নিয়ে আসত। এরপর তাদের কাছ থেকে এডভান্স মানির নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে তরুণ-তরুণীদের বিভিন্ন স্থানে বন্দি করে রাখত। সম্প্রতি, ভয়ংকর এ ফাঁদ ধরা পড়ে র‌্যাবের অভিযানে। কোম্পানিটিতে অভিযান চালিয়ে আটকে রাখা দেড়শ তরুণ-তরুণীকে উদ্ধার এবং ৮ প্রতারককে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।  

র‌্যাবের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) সুজয় সরকার জানান, কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে প্রথমে বিষয়টি র‌্যাবের পক্ষ থেকে তদন্ত করা হয়। তদন্তে সত্যতা মেলায় গত শনিবার ৭ সেপ্টেম্বর উত্তরার তুরাগ এলাকার ঐ প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো হয়। এ সময় ৮ প্রতারককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ওই এলাকার বিভিন্ন বাসাবাড়ি থেকে দেড়শ তরুণ-তরুণীকে উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ৩০ জন নারী রয়েছেন।

গ্রেফপ্তার হওয়া ৮ জন হলো— জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জের মো. মর্তুজা (২৮), গাজীপুর জয়দেবপুরের মো. হোসাইন আহম্মেদ খাঁন ওরফে শাহাদৎ (২২), রাজশাহীর বাঘা উপজেলার মো. আরিফ হোসেন ওরফে আহসান হাবিব (২০), মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার মো. আমিনুল ইসলাম (২২), পাবনার আতাইকুলার মো. ওবাইদুল হক (২৭), যশোরের অভয়নগর উপজেলার মো. ইয়ামিন ইসলাম (২০), পাবনা সদরের মোছা. নাজনীন সুলতানা নিশা (২৯) ও রাজশাহী চারঘাটের মো. ইসমাইল হোসেন (২৭)।

এ ঘটনায় তুরাগ থানায় ভুক্তভোগী মোহাম্মদ মিলন বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে প্রতারক চক্রের সদস্যদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।

জিম্মি দশা থেকে মুক্তি পেয়ে সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান ভুক্তভোগীরা। এদের মধ্যে একজনের নাম মোহাম্মদ মিলন (২০)। তাঁর বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার আলাইয়াপুর ইউনিয়নে। বন্ধু জিয়ার মাধ্যমে গত ১৫ জুলাই উত্তরায় লাইফওয়ে কোম্পানির ওই অফিসে যোগাযোগ করেন। ঢোকার আগে তার বন্ধু জানান, এখানে যারা কাজ করেন, তারা সবাই সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা। এখানে চাকরি করলে ভালো সুযোগ-সুবিধা আছে।

এরপর অফিসে সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসেন মিলন। সিনিয়র কর্মকর্তারা বলেন, কোম্পানিতে কাজ হবে অনলাইনে অ্যাড দেওয়া। পোস্ট হবে সিনিয়র অ্যাডভাইজার। মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বেতন, থাকা-খাওয়া ও চিকিৎসা ফ্রি। তবে এখানে যোগ দেওয়ার আগে জামানত হিসেবে ৫০ হাজার টাকা জমা দিতে হবে। আইডি কার্ড ও অন্যান্য বাবদ আরও ৫০০ টাকা দিতে হবে।

তিনি জানান, টাকা দিতে সময় নিচ্ছিলাম। এরই মধ্যে বন্ধু জিয়া জানায়, সে ভালো আছে। চাইলে মিলনও ভালো থাকতে পারবে। এটা সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কোম্পানি। এরা পালাবে না। ভালো চাকরি পেতে হলে টাকা কিছু দিতেই হয়। বন্ধুর পরামর্শে ৫০ হাজার ৫০০ টাকা জামানত হিসেবে জমা দেই। এরপর আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় একটি ভবনে। সেখানকার এক রুমে গিয়ে দেখেন আরও ১৫ জনের মতো তরুণ। তারা বলেন, তারা ভুল করে এখানে এসে পড়েছেন, একই ভুল মিলনও করেছেন!

মিলন বলেন, আমাকে খুশি রাখার জন্য বিভিন্ন সময় ডিজে পার্টিতে নিয়ে যেত। গাড়িতে করে ঘুরানো হতো। ভালো ভালো রেস্টুরেন্টে নিয়ে যেত। এক সপ্তাহ পর কোম্পানির এক লোক এসে পরিচালক পরিচয় দিয়ে আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন। সেখানে একটি রুমে আমাকে বলা হলো, অনেক দিন তো আরাম করলেন, এবার কাজ শুরু করেন। আপনার পরিচিত বন্ধু-বান্ধবদের এখানে ডেকে আনেন। শুধু আপনি ভালো থাকতে চান, নাকি কাছের বন্ধু বান্ধবদেরও ভালো রাখতে চান?

মিলন বলেন, তাদের কথায় রাজি না হলে আমাকে প্রথমে মানসিকভাবে নির্যাতন করা হতো। তিন দিন খেতে দেওয়া হয়নি আমাকে। এরপর শারীরিক নির্যাতন শুরু করে। তাদের অত্যাচারে অতীষ্ট হয়ে আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো বন্ধু রুবেল ও ফরহাদকে ডেকে নিয়ে আসি। তাদের বুঝিয়ে বলি, আমি ও জিয়া এখানে টাকা দিয়েছি। ভালো চাকরি করছি। তোরাও টাকা দে, ভালো হবে। আমার কথা মতো রুবেল ও ফরহাদ ৫০ হাজার ৫০০ টাকা করে দেয়। এভাবে তারাও আরও কয়েকজনকে নিয়ে আসে এবং তারাও একই পদ্ধতিতে টাকা দেয় কোম্পানিতে।

মিলন বলতে থাকেন, একটি রুমে থাকা-খাওয়া ছাড়া আর কোনো কাজ নেই এখানে। আমরা সবাই বুঝতে পারছি যে এখানে লোক এনে টাকা দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই। একটা রুমের মধ্যে ১০-১৫ জনকে আটকে রাখা হতো। কেউ ঝামেলা করলে তাকে অন্য জায়গায় নিয়ে রাখা হতো। নতুন ও পুরনোদের এক জায়গায় রাখা হতো না। অনেক মেয়ে বন্ধুকেও নিয়ে আসতে বাধ্য করেছে কোম্পানির কর্মকর্তারা। তবে আমি কোনো নারীকে নিয়ে আসিনি। আর বন্ধু জিয়া পরে আমার কাছে স্বীকার করেছে, নির্যাতন সহ্য করতে না পেরেই আমাকে নিয়ে এসেছিল এই প্রতারণার ফাঁদে।

মিলন জানান, নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে গত সপ্তাহে এক মামাকে খুলে বলেন সব কথা। পরে সেই মামা র‌্যাব -১-এ অভিযোগ দিলে তারা অভিযান চালায়। তবে সবাইকে উদ্ধার করা যায়নি। নোয়াখালী থেকে যে ১৫ জনের মতো এসেছিলেন, তাদের মধ্যে মাত্র তিন জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি ১২ জনের কাউকে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।

মিলনের মতোই প্রতারিত হয়ে নিঃস্ব হয়েছেন পটুয়াখালী থেকে আসা সানজিদা আক্তার (ছদ্ম নাম)। তিনি বলেন, বন্ধুর পরামর্শে এসে টাকাও হারিয়েছি, সম্মানও হারিয়েছি। এরকম সময় যেন কারও জীবনে না আসে। এখানে আসার সিদ্ধান্ত ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। বাবাকে হারিয়েছি আগেই, মায়ের কষ্টের টাকায় জেলা শহরে পড়ছিলাম। স্বপ্ন দেখতে গিয়ে জীবনটাই শেষ হতে চলেছে। মান-সম্মান, টাকা সবই গেল।

সানজিদা বলেন, অনেক সময় তারা বলত, বড় কোনো জায়গায় পাঠাতে চাইলে যাবেন কি না। সরকারি বড় কর্মকর্তাদের কাছে গেলে মোটা অঙ্কের টাকা পাওয়া যাবে। রাজি না হওয়ায় খেতে দেওয়া হয়নি। অন্য নারীকে দিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে। র‌্যাবের অভিযানে আজ সেই জিম্মি দশা থেকে মুক্তি পেলাম।

র‌্যাবের কর্মকর্তা সুজয় সরকার বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা এসব বেকার তরুণ-তরুণীরা চাকরির আশায় এসেছিলেন। জামানতের নামে ৫০ হাজার ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে প্রত্যেকের কাছে। টাকা দেওয়ার পর এক থেকে দুই মাস প্রশিক্ষণ শেখানোর নামে যে কৌশল অবলম্বন করা হয়, তা মূলত প্রতারণার কৌশল। টাকা দিতে পারলে কিছু কমিশন পাওয়া যায়।
প্রশিক্ষণের সময় প্রতারক চক্রের সদস্যরা ভিকটিমের মোবাইল ফোন নিয়ে নিজেদের কাছে রেখে দেয় এবং তাদের নজরবন্দি করে রাখে, যেন তারা বাড়িতে কিংবা বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারে। এছাড়াও ভিকটিমরা নিজেদের মধ্যে যেন ঘনিষ্ঠ হতে না পারে, সেজন্য ঘন ঘন তাদের রুম পরিবর্তন করানো হয়। অনেকে এই কাজে অস্বীকৃতি জানায় এবং জামানত ফেরত চায়। যারা তাদের সঙ্গে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায়, তাদের জামানতের টাকা ফেরত না দিয়ে খালি স্ট্যাম্পে নেওয়া সইয়ের কথা বলে ভয় দেখানো হতো। এছাড়াও প্রতারক চক্রটি নিজেদের সামরিক বহিনীর সদস্য বলে পরিচয় দিয়ে হুমকি দিয়ে আসত। ফলে জিম্মি তরুণ-তরুণীরাও নিরুপায় হয়ে তাদের সব কথা মেনে নিতে বাধ্য হতো।

জা/
 

feature-top
feature-top

আরও খবর »

feature-top