দেশজুড়ে

অবাধে চলছে অবৈধ ইটভাটা, দূষণে ভারী হচ্ছে পরিবেশ

নেত্রকোনায় অবাধে চলছে অবৈধ ইটভাটা। উপজেলা, জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে  ম্যানেজ করেই ভাটা পরিচালনা করার দাবি করছে এসব ইটভাটার মালিকরাতবে প্রশাসনের দাবি  মামলা জটিলতার কারণে বন্ধ করা যাচ্ছে না ইটভাটা।

জানা গেছে, প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে জেলার ৪০টি ইটভাটার মধ্যে এ বছর চালু আছে ৩২টি। মৌসুমের শুরুতে প্রশাসন ছয়টিতে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা মাধ্যমে আর্থিক জরিমানা করেন। কিন্তু এগুলোতে এখন ইট পোড়ানোর কর্যক্রম চালুও আছে।  বন্ধ করার কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি

অভিযোগ আছে,   স্থানীয় প্রশাসন ম্যানেজ করে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির উপরিভাগ, খাস পতিত জমি, নদীর চর, বিল ও খালের মাটি নেওয়া হচ্ছে ইটভাটায়। এসব মাটি পরিবহনে প্রতিনিয়ত ট্রাক্টর চলাচল করায় গ্রামীণ রাস্তার ক্ষতি হচ্ছে। ইটভাটার ধোঁয়ায় আশপাশের পরিবেশের মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফসলি জমি হারাচ্ছে উর্বরতা।

উচ্চ আদালতে আদেশের তথ্য মতে, পরিবেশবাদী সংগঠন "হিউম্যান রাইট'স অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ" এর পক্ষে ২০২৩ সালে ১০ নভেম্বর উচ্চ আদালতে রিট করা হয়। বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই বছর ১৩ নভেম্বর দেশের অবৈধ সব ইটভাটা বন্ধ করতে আদেশ দেন। এ আদেশে মন্ত্রীপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও পরিবেশ সচিবকে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিতে বলা হয়। অন্যান্য এলাকায় কিছু ইটভাটা বন্ধ করা হলেও নেত্রকোনার কোতাও প্রশাসন তা কার্যকর করেনি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ২০১৩ সালের ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইনের ৪ধারায় বলা আছে, ইটভাটা যে জেলায় অবস্থিত, সেখানকার জেলা প্রশাসকের লাইসেন্স গ্রহণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি ইটভাটা স্থাপন ও ইট প্রস্তুত করতে পারবেন না। ওই আইনের ৮(১) ধারায় বলা আছে, ছাড়পত্র থাকুক বা না থাকুক, আইন কার্যকরের পর আবাসিক বাণিজ্যিক ও সংরক্ষিত এলাকা, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা উপজেলা সদর, সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন বন, অভয়ারণ্য, বাগান, জলাভূমি, কৃষিজমি এবং বিশেষ কোনো স্থাপনা, রেলপথ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, অনুরূপ কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে এক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে ভাটা স্থাপন করা যাবে না। কিন্তু এর নিয়ম মানা হয়নি ইটভাটা গুলোতে। এসব ইটভাটা থেকে জনবসতি, বাজার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব খুবই কম।

 সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, নেত্রকোনা সদর উপজেলা সহ ৯টি উপজেলার অধিকাংশ ভাটার পাশেই ফসলি জমি, বিদ্যালয়, কলেজ, বাজার, স্বাস্থ্য কেন্দ্র, সড়ক, রেললাইন ও জনবসতি এগুলোর কোন একটি আছে। জেলার আটপাড়া মাটিকাটা গ্রামের কাঞ্চন ও স্কুল শিক্ষার্থী সাব্বির ও তাজবীদ সহ অনেকেই বলেন, নেহল ব্রিকস নামে ইটভাটার ধুলাবালিতে তাদের ভোগান্তি পোহাতে হয়।

 নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকটি ইটভাটার মালিক পক্ষের প্রতিনিধি বলেন, ভাটা পরিচালনা করতে অনেক কষ্ট হয়। সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি অফিসে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে রাখতে হয়।

কেন্দুয়ার ভগবতীপুর গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাস্তা ও বসতবাড়ির আশপাশে ইটভাটার ধুলাবালি ও কয়লার কণা ওড়ে। এতে শিশু ও বয়স্করা শ্বাসকষ্ট সহ নানা রোগে ভুগছে। ফল গাছের ফলনও, ফসলী জমিতে ধান ও সবজীর ফলন কমে গেছে। গত বছর প্রশাসন "ঢাকা ব্রিক'স" নামের ইটভাটাটি বন্ধ করলেও পরদিন মালিক পক্ষ আবার চালু করে। প্রশাসনকে জানিয়ে লাভ হয় না। উল্টো ভাটার মালিক পক্ষের হুমকি ধামকিতে এলাকা থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে। প্রশাসন ভ্রাম্যমান আদালতের নামে জনসাধারণের সাথে তামাশা করে। সরকারের উচ্চ মহল কাছে এসব অবৈধ ইটভাটা বন্ধে হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

নেত্রকোনা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মোশারফ হোসেন বলেন, জেলার ইটভাটায় প্রায় দশ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সাথে সমসংখ্যক পরিবারের জীবিকাও নির্বাহ হচ্ছে। আমি মনে করি সরকার নীতিমালা সহজ করে ইটভাটা শিল্পকে রক্ষা করতে উদ্যোগ নিবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির নেটওয়ার্ক (বেলা) সদস্য ও এআরএফবি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার খান বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের বিদি মোতাবেক যে সমস্ত ইটভাটা চলতে পারবে না সেগুলো প্রশাসনের বন্ধ করে দেওয়া উচিত।

নেত্রকোনা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল মতিন বলেন, জেলায় ৩২টি ইটভাটা চালু আছে। এর মধ্যে ৪টির পরিবেশের ছাড়পত্র রয়েছে। এ বছর কেন্দুয়া ৪টি, মদনে ২টি ও আটপাড়ায় ২টি ভাটায় ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়েছে। মামলা জটিলতার কারণে অবৈধ ভাটা গুলো বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেন পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন যৌথভাবে অবৈধ ইটভাটায় নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করছে। সরকারি জমি এবং নদী ও বিলের অংশ থেকে ইটভাটায় মাটি নেওয়ার বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে

আই/এ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন