এপস্টেইন তদন্তে নাটকীয় মোড়, সাক্ষ্য দিবেন বিল ও হিলারি ক্লিনটন
ওয়াশিংটনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টেইনকে ঘিরে প্রকাশিত নথিপত্র। বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলা এই নথির রেশ গিয়ে ঠেকেছে মার্কিন রাজনীতির সর্বোচ্চ মহলে। সেই প্রেক্ষাপটেই বড় সিদ্ধান্তে এলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও তার স্ত্রী সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন।
এপস্টেইন–সংক্রান্ত তদন্তে মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের একটি কমিটির সামনে সাক্ষ্য দিতে সম্মতি দিয়েছেন ক্লিনটন দম্পতি।
মঙ্গলবার (০৩ ফেব্রুয়ারি) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
ক্লিনটনের মুখপাত্র জানান, তারা হাউস ওভারসাইট ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত কমিটির ডাকে সাড়া দিয়ে সশরীরে হাজির হবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ গত শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) এপস্টেইন সংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ নথি প্রকাশ করার পরই বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এসব নথিতে রয়েছে ৩০ লাখের বেশি পৃষ্ঠা, এক লাখ ৮০ হাজার ছবি এবং প্রায় দুই হাজার ভিডিও। এর আগে গত নভেম্বরে এসব নথি প্রকাশের নির্দেশ দেয় কংগ্রেসের উভয় কক্ষ। রাজনৈতিক চাপের মুখে তখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও নথি প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
নতুন নথিতে উঠে এসেছে বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, ধনকুবের ইলন মাস্ক এবং মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের মতো ব্যক্তিত্বরা রয়েছেন সেই তালিকায়। তবে এসব নামের অনেকগুলো আগেও প্রকাশিত নথিতে ছিল।

এর আগে এই তদন্ত কমিটির সামনে হাজির হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন বিল ও হিলারি ক্লিনটন। ফলে হাউস রুলস কমিটি তাদের বিরুদ্ধে ‘কংগ্রেস অবমাননার’ প্রস্তাবে ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সাক্ষ্য দিতে রাজি হওয়ায় সেই ভোট আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভোটটি হলে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতর প্রকাশ্য বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠত।
কংগ্রেসের তদন্ত কমিটি মূলত খতিয়ে দেখছে—এপস্টেইনের বিরুদ্ধে অতীতে কীভাবে তদন্ত পরিচালিত হয়েছিল এবং কোথায় ব্যর্থতা ছিল। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ক্লিনটন দম্পতিকে তলব করা হয়।
ক্লিনটনের মুখপাত্র অ্যাঞ্জেল উরেনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী তদন্ত কমিটির সামনে উপস্থিত হয়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চান, যা অন্যদের অনুসরণ করা উচিত।
রিপাবলিকানদের নেতৃত্বাধীন কমিটির চেয়ারম্যান জেমস কোমার এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। তার মতে, এপস্টেইনের সঙ্গে প্রভাবশালী রাজনীতিকদের সম্পর্ক স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির একটি অংশ অভিযোগ করছে, এই তদন্তকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতিপক্ষদের হেনস্তা করা হচ্ছে। তারা আরও প্রশ্ন তুলেছেন—এপস্টেইনের দীর্ঘদিনের বন্ধু ও সহযোগী হিসেবে পরিচিত ট্রাম্পকে কেন এখনো সাক্ষ্য দিতে ডাকা হয়নি, বরং তিনি পুরো আইনি প্রক্রিয়ার তদারকিতে রয়েছেন।

এখন পর্যন্ত এপস্টেইনের ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে ক্লিনটন দম্পতি বা ট্রাম্পকে সরাসরি জড়িয়ে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। তবে রিপাবলিকানদের দাবি, ২০০০ সালের দিকে এপস্টেইনের ব্যক্তিগত জেট ব্যবহারের প্রমাণ থাকায় বিল ক্লিনটনের ভূমিকা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
বিল ক্লিনটন স্বীকার করেছেন, ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের মানবিক কার্যক্রমে তিনি একাধিকবার এপস্টেইনের জেট ব্যবহার করেছিলেন। তবে তার দাবি, তিনি কখনোই ‘এপস্টেইন আইল্যান্ড’ নামে পরিচিত দ্বীপে যাননি। হিলারি ক্লিনটনের ভাষ্য, এপস্টেইনের সঙ্গে তার কোনো অর্থপূর্ণ যোগাযোগ ছিল না এবং তিনি কখনো জেটে ভ্রমণ বা দ্বীপে যাননি।
এর আগে তারা এপস্টেইন ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিলেইন ম্যাক্সওয়েল সম্পর্কে যা জানতেন, তা লিখিত বক্তব্য আকারে জমা দিয়েছিলেন। বর্তমানে গিলেইন ম্যাক্সওয়েল যৌন নিপীড়নের অভিযোগে ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
কারাগারে আটক অবস্থায় ২০১৯ সালে আত্মহত্যা করেন জেফরি এপস্টেইন। বিচার বিভাগ জানিয়েছে, সদ্য প্রকাশিত নথিগুলোই চূড়ান্ত—এর পর এপস্টেইন সংক্রান্ত নতুন কোনো নথি প্রকাশের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
১৯৮৩ সালে জেরাল্ড ফোর্ডের পর এই প্রথম কোনো সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের তদন্ত প্যানেলের সামনে সাক্ষ্য দিতে যাচ্ছেন। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে।
এসি//