১৯৭৩ থেকে ২০২৪, যেমন ছিল বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে ১৯৭৩ সালের প্রথম নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং সামরিক শাসকরা ক্ষমতায় থেকেছে, এই নির্বাচনগুলো কখনো অংশগ্রহণমূলক, আবার কখনো বিতর্কিত, বর্জন বা একতরফা ছিল। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনগুলো তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য হলেও, পরের নির্বাচনগুলো ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।
বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন কেমন ছিলো ১৯৭৩ সালে?
বাংলাদেশের স্বাধীনতার এক বছরের মাথায় ১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের নতুন সংবিধান প্রণয়নের পর প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের সাতই মার্চ।
মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগের হাতে তখন দেশের শাসন ক্ষমতা। দেশের সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল দলটি এবং ভোটারদের পছন্দের জায়গায় ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু এই সব ধারণাই পাল্টে দিয়েছিল বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গল্প। গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে সরকার গঠন করতো এতে কোনো সন্দেহ ছিল না। কিন্তু এরপরও সেই নির্বাচনে সারা দেশে ব্যাপক অনিয়ম-কারচুপির ঘটনা ঘটেছিল। এমনকি, একজন প্রার্থীকে জেতাতে হেলিকপ্টারে করে ব্যালট পেপার ঢাকায় নিয়ে আসার মতো ঘটনাও ঘটেছিল।
দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৭৯
দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয় লাভ করে; তারা জাতীয় সংসদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসন লাভ করে। মোট ভোট সংগৃহীত হয়েছিল ৫১.৩%।
তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৮৬
বাংলাদেশে ৭ই মে ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। নির্বাচনে মোট ১,৫২৭ জন প্রার্থী অংশগ্রহণ করে।[৫] নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসন নিয়ে জয় লাভ করে। মোট ভোটারের ৬১.১% ভোট সংগৃহীত হয়েছিল।
চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৮৮
চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ৩রা মার্চ ১৯৮৮ সালে । নির্বাচনটি বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রধান দলই বর্জন করেছিল; যেমন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ, জাতীয় আওয়ামী পার্টি (মোজাফফর) এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। নির্বাচনে জাতীয় পার্টি জয় লাভ করে, তারা ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৫১টি আসন লাভ করে। মোট ভোটারদের মধ্যে ৫২.৫% ভোট গৃহীত হয়েছিল।
পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৯১
২৭শে ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশে এ নির্বাচনের মাধ্যমেই একটি গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা উপহার পায়।তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে এটি ছিল প্রথম নির্বাচন। নির্বাচনে দুটি প্রধান দল, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছিল শেখ হাসিনা; বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বে ছিল খালেদা জিয়া। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনের বিপরীতে ৪২৪ জন সতন্ত্র প্রার্থীসহ ৭৫টি দল থেকে মোট ২৭৮৭ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেয়। নির্বাচনে খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন বিএনপি জয় লাভ করে। তারা ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৪২টি আসন লাভ করে। মোট ভোট গৃহীত হয়েছিল ৫৫.৪%।
ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৯৬
১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়। অধিকাংশ বিরোধী রাজনৈতিক দল নির্বাচনটি বর্জন করেছিল। মোট ভোট গৃহীত হয়েছিল মাত্র ২১%] বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচনে জয় লাভ করে এবং ৩০০টি আসনের মধ্যে ৩০০টি আসনই লাভ করে। পরবর্তীতে নিরপেক্ষ নির্বাচন জুনে অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে ছোট সংসদ ছিল এটি।
সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৯৬
১২ই জুন ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে দুটি প্রধান দল, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছিল শেখ হাসিনা; বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বে ছিল খালেদা জিয়া। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনের বিপরীতে ২৮১জন সতন্ত্র প্রার্থীসহ ৮১টি দল থেকে মোট ২৫৭৪ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেয়। ৩০০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসনে জয়লাভ করে। উক্ত নির্বাচনে সতন্ত্র প্রার্থীরা ০.৬৭% এবং দলীয় প্রার্থীরা ৭৪.৮২% ভোট লাভ করে।
অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০০১
১ই অক্টোবর ২০০১ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে দুটি প্রধান দল, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছিল শেখ হাসিনা; বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বে ছিল খালেদা জিয়া। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনের বিপরীতে ৪৮৪জন সতন্ত্র প্রার্থীসহ ৫৪টি দল থেকে মোট ১৯৩৫ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেয়। এটি হলো ১৯৯৬ সালে চালু হওয়া তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দ্বিতীয় নির্বাচন। নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় তত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ছিলেন লতিফুর রহমান।এই নির্বাচন এ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল(বিএনপি) জয় লাভ করে
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০০৮
২৯শে ডিসেম্বর ২০০৮ সালে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল তত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ-এর নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকারের অধীনে। সামরিক সরকার ২০০৭ সালের শুরুর দিকে জরুরী অবস্থা জারি করে যা ২০০৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর তুলে নেওয়া হয়। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এবং এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয় লাভ করে।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৪
৫ই জানুয়ারি ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনটি নবম জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ অধিকাংশ দলই বর্জন করে এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্রসহ ১৭টি দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এছাড়াও নির্বাচনে সাধারণ মানুষের ভোটের মাধ্যমে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৪টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৮
৩০ শে ডিসেম্বরে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৫৭টি আসন লাভ করে বিজয় অর্জন করে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৪
৭ জানুয়ারি, ২০২৪, রোববার ভোটগ্রহণের দিন রেখে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, এ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত চলে, তা বাছাই হয় ১ থেকে ৪ ডিসেম্বর। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১৭ ডিসেম্বর। তার তিন সপ্তাহ পর হয় ভোটগ্রহণ। এটি মূলত একটি একতরফা নির্বাচন হিসাবে দেশে - বিদেশে সমালোচিত, এই নির্বাচনে ব্যাপক ভোট কারচুপি করা হয়, বিকাল ৩ টায় ২৭.১৫% ভোট পড়ে বলে নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয় কিন্তুু তার ১ ঘন্টা পর ভোট শেষ হলে জানানো হয় ৪১% হয়েছে, ১ ঘন্টায় ১৩% ভোট, যা কল্পনার বাহিরে কারচুপির উদাহরন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২২২, জাতীয় পার্টি ১১, ওয়ার্কার্স পার্টি ১, জাসদ ১, কল্যাণ পার্টি ১ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৬২ আসনে বিজয়ী হয়েছেন বাংলাদেশের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি বলে মনে করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচনে আয়োজিত সাধারণ নির্বাচন যা ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। ৫ই আগস্ট ২০২৪-এ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নেয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ নেয়। অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে সংস্কার বাস্তবায়নের পর একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ১০ মে নির্বাহী আদেশে জুলাই গণহত্যা মামলার বিচারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তবর্তী সরকার। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এটিই প্রথম যেখানে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করছে না।
এআর//