হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়ায় বিশ্বের প্রতিক্রিয়া
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত করা হয়েছে।
শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) আরাঘচি জানান, ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৌশলগত এই জলপথটি পুরোপুরি খুলে দেয়া হয়েছে।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্পও বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি দাবি করেন, ইরান ভবিষ্যতে আর কখনো হরমুজ প্রণালি বন্ধ না করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তবে ট্রাম্প আরও উল্লেখ করেন, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ কার্যকর থাকবে।
এদিকে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে প্যারিসে প্রায় ৪০টি দেশের অংশগ্রহণে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো একমত হয়েছে যে, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ বন্ধ হলে হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে তারা ভূমিকা রাখবে।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করা হয়। এই পথে ট্যাংকার চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পক্ষ থেকে মিশ্র বার্তার মাঝে বিশ্ব নেতারা সতর্ক অবস্থান দেখিয়ে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা হলো-
যুক্তরাষ্ট্র
ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং ব্যবসার জন্য প্রস্তুত। তবে ইরানের ক্ষেত্রে নৌ-অবরোধ কার্যকর থাকবে, যতক্ষণ না চুক্তি সম্পন্ন হচ্ছে।
এর কিছুক্ষণ পর তিনি আরেক পোস্টে বলেছেন, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু কর্মসূচিসহ সব বিষয়ে চুক্তিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত অবরোধ বজায় থাকবে। পরবর্তীতে ট্রাম্প এএফপিকে বলেন, যুদ্ধ শেষের চুক্তি খুব কাছে এবং কোনো অমীমাংসিত বিষয় নেই।
ইরান
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্সে দেয়া এক পোস্টে বলেন, প্রণালিটি পুরোপুরি উন্মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ১০ দিনের ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতির সময় পর্যন্ত এই ঘোষণা কার্যকর হবে। তবে কিছু ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আরাঘচির ঘোষণার বিপরীত তথ্য দিয়েছে। একজন সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কেবল বেসামরিক জাহাজগুলো আইআরজিসির নৌবাহিনীর অনুমতি নিয়ে চলাচল করতে পারবে। নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অবস্থান অজানা থাকায় দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদের রহস্যজনক নীরবতার কথা উল্লেখ করেছে ফার্স নিউজ এজেন্সি।
যুক্তরাজ্য
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার শুক্রবার প্যারিসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি সম্ভাব্য সামরিক মিশন নিয়ে শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করেন। এতে প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি দেশ সরাসরি বা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অংশ নেয়।
স্টারমার প্রণালি খুলে দেয়ার খবরকে সতর্কতার সঙ্গে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এই ঘোষণা স্থায়ী এবং কার্যকর হতে হবে। পরিস্থিতি অনুকূল হলে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় একটি শান্তিপূর্ণ এবং রক্ষণাত্মক অভিযানের নেতৃত্ব দেবে।
ফ্রান্স
বৈঠকের পর ম্যাক্রোঁ বলেন, আমরা সকল পক্ষের কাছে হরমুজ প্রণালি পূর্ণাঙ্গ, অবিলম্বে এবং শর্তহীনভাবে খুলে দেয়ার দাবি জানাই। এই প্রণালিকে ব্যক্তিগতকরণ করার চেষ্টা বা কোনো টোল সিস্টেমের সমতুল্য করার বিষয়ে তিনি অসম্মতি জানিয়েছেন।
ম্যাক্রোঁর কার্যালয় জানায়, এই আন্তর্জাতিক জোটে সদস্য দেশগুলোর ভূমিকার মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, মাইন অপসারণ, সামরিক এসকর্ট এবং উপকূলীয় দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
জার্মানি
চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ বলেছেন, জার্মানি এই মিশনে মাইন অপসারণ এবং গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে পারে। তবে এর জন্য সংসদীয় সমর্থন এবং একটি নিরাপদ আইনি ভিত্তি প্রয়োজন। তিনি এই মিশনে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কামনা করলেও ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ন্যাটোর সহায়তা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ফিনল্যান্ড ও জাতিসংঘ
ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব বলেন, আমরা ইরান কর্তৃক প্রণালি খোলার ঘোষণাকে স্বাগত জানাই। স্থায়ী সমাধানের জন্য কূটনীতি প্রয়োজন।
অন্যদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এ পদক্ষেপকে সময়ের সঠিক সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেছেন।
আন্তর্জাতিক নৌ সংস্থা ও শিপিং কোম্পানি
আইএমও মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গুয়েজ জানান, তারা বর্তমানে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতার শর্তগুলো যাচাই করছেন। নরওয়েজিয়ান শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন এবং হ্যাপাগ-লয়েড জানিয়েছে, মাইন এবং ঝুঁকির বিষয়ে নিশ্চিত সমাধান না আসা পর্যন্ত তারা এখনই জাহাজ পাঠাচ্ছে না। ডেনমার্কের মার্সক জানিয়েছে, তাদের কাছে ক্রু ও জাহাজের নিরাপত্তা সবার আগে। তাই ঝুঁকি মূল্যায়নের পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাজার পরিস্থিতি
ইরানের ঘোষণার পর তেলের বাজারে বড় ধস নেমেছে। এক্সটিবি’র গবেষণা পরিচালক ক্যাথলিন ব্রুকস বলেন, এই পদক্ষেপ যুদ্ধ শেষ হওয়ার এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হওয়ার আশা জাগিয়েছে।
এসি//