করোনার মতো আরও এক মহামারির ঝুঁকিতে বিশ্ব
মধ্য আফ্রিকার দেশ কঙ্গোতে আবারও প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নতুন করে উদ্বেগে ফেলেছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে নীরবে ছড়িয়ে পড়া এই সংক্রমণ বিশেষ করে গৃহযুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সংকটে থাকা এলাকাগুলোতে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এ পর্যন্ত প্রায় ২৫০ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ৮০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) মনে করছে, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি গুরুতর হলেও এটি কোভিড-১৯-এর মতো বৈশ্বিক মহামারিতে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ ইবোলা বাতাসে ছড়ায় না এবং সাধারণত দ্রুত শনাক্ত করে আক্রান্তদের বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার বড় প্রাদুর্ভাবে প্রায় ২৮ হাজার ৬০০ জন আক্রান্ত হলেও সংক্রমণ বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হয়নি।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যানডেমিক সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের ড. আমান্ডা রোজেক বলেছেন, বৈশ্বিক মহামারির আশঙ্কা কম হলেও বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং এটি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমন্বয় জরুরি।
বর্তমান সংক্রমণটি ইবোলার বিরল “বুন্দিবুগিও” প্রজাতির কারণে ছড়াচ্ছে। এর আগে ২০০৭ ও ২০১২ সালে মাত্র দুবার এই ধরন শনাক্ত হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রজাতিতে আক্রান্তদের প্রায় ৩০ শতাংশের মৃত্যু হতে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, বুন্দিবুগিও প্রজাতির বিরুদ্ধে এখনো কোনো অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। এমনকি প্রচলিত কিছু ইবোলা পরীক্ষাও শুরুতে এটি শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। কঙ্গোতে প্রথম দিকের পরীক্ষাগুলো নেতিবাচক এলেও পরে উন্নত পরীক্ষায় ভাইরাসটির উপস্থিতি নিশ্চিত হয়।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ট্রুডি ল্যাংয়ের মতে, এই বিরল প্রজাতি মোকাবিলা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ইবোলার লক্ষণ সাধারণত সংক্রমণের ২ থেকে ২১ দিনের মধ্যে প্রকাশ পায়। শুরুতে জ্বর, মাথাব্যথা ও দুর্বলতা দেখা দিলেও পরে বমি, ডায়রিয়া, অঙ্গ বিকল হওয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণ হতে পারে। নির্দিষ্ট ওষুধ না থাকায় মূলত সাপোর্টিভ কেয়ারের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, আক্রান্তদের দ্রুত আইসোলেশনে নেওয়া, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং নিরাপদ চিকিৎসা ও দাফন নিশ্চিত করার মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। তবে যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সংকটের কারণে কঙ্গোর অনেক এলাকায় এই কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, প্রতিবেশী উগান্ডা, দক্ষিণ সুদান ও রুয়ান্ডাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ইতোমধ্যে উগান্ডায় দুইজনের শরীরে ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
তবে আশাবাদের জায়গাও রয়েছে। কঙ্গোর স্বাস্থ্য বিভাগ ইবোলা মোকাবিলায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস, দ্রুত আন্তর্জাতিক সহায়তা ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।