আইন-বিচার

রামিসা হত্যার তদন্তে নতুন মোড়!

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে শুনানির প্রথম দিনেই প্রধান আসামি সোহেল রানার একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

আদালতে হাজির করার সময় সোহেল রানা সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, এই অপরাধের পেছনে "ডলার" নামে অন্য এক ব্যক্তি জড়িত। তবে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এই দাবি নাকচ করে জানিয়েছেন, তদন্তে ডলার নামের কারও কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।

সোমবার (০১ জুন) ঢাকার শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার কাজ শুরু হয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে আদালত কক্ষে নেওয়ার সময় সোহেল রানা উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশ্য করে চিৎকার করে বলতে থাকেন, রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছে ডলার নামের একজন। সে কেবল মৃতদেহটি লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করেছিল।

তিনি আরও দাবি করেন, ডলারের বাসা মিরপুর-১১ এলাকায় এবং রামিসাকে এনে দেওয়ার জন্য তাকে দুই লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

শুনানি শেষে হাজতখানায় নেওয়ার সময়ও একই দাবি পুনরাবৃত্তি করেন সোহেল রানা। তিনি বলেন, ডলারকে খুঁজলে সব সত্য বের হবে। তবে এ সময় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার কোনো মন্তব্য করেননি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ডলার পল্লবী এলাকারই বাসিন্দা এবং পেশায় অটোরিকশাচালক। তিনি মাদকাসক্ত হিসেবে এলাকায় পরিচিত। সোহেল রানার সঙ্গে তার পরিচয় ছিল স্থানীয় একটি গ্যারেজের মাধ্যমে। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, ডলার ধনী নন, তবে তাদের পরিবার এলাকার বাড়ির মালিক ও আর্থিকভাবে সচ্ছল।

ডলারের বড় ভাই সেলিম রায়হান বলেন, দীর্ঘ প্রায় ১৯ বছর ধরে পরিবারের সঙ্গে ডলারের সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, যদি এ ঘটনায় ডলারের কোনো সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়, তাহলে তারও সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ওহিদুজ্জামান ভূঁইয়া জানিয়েছেন, তদন্তের সময় ডলার নামে একজনের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেলেও তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ মেলেনি।

তিনি বলেন, সাক্ষ্য-প্রমাণ, ডিজিটাল তথ্য এবং তদন্তে ঘটনাস্থলে ডলারের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। এজন্য চার্জশিটে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, সোহেল রানা ও তার স্ত্রীর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেও ডলারের নাম উঠে আসেনি। এছাড়া সোহেল রানার সঙ্গে ডলারের পূর্বশত্রুতার তথ্যও পাওয়া গেছে। তার মতে, বিচার প্রক্রিয়াকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই আসামি নতুন এই দাবি উত্থাপন করে থাকতে পারেন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, তদন্তে ডলারের সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তার ভাষায়, পেশাদার অপরাধীরা অনেক সময় তদন্তকে বিভ্রান্ত করতে অন্য ব্যক্তির নাম সামনে আনে। আদালতে আসামি এ বিষয়ে কিছু বলেনি, শুধু গণমাধ্যমের সামনে বলেছে।

অন্যদিকে রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী মূসা কালিমূল্যাহ জানান, আসামির সঙ্গে তার আলোচনায় ডলারের বিষয়ে কোনো কথা ওঠেনি। আসামিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন।

গত ১৯ মে সকালে রাজধানীর পল্লবীর একটি বহুতল ভবনের তৃতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসা আক্তারের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর সোহেল রানা বাসার গ্রিল কেটে পালিয়ে গেলেও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ঘটনাস্থল থেকেই আটক করা হয়। পরে একই দিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পরদিন শিশুটির বাবা পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। একই দিনে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন সোহেল রানা। ঘটনার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায়, ২৪ মে পুলিশ মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করে।

মামলাটির বিচার কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। তদন্ত সংস্থার দাবি, প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই চার্জশিট দেয়া হয়েছে এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হবে।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন