দেশজুড়ে

শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে এইচএসসি পরীক্ষায় অনামিকা

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কোনোভাবেই থামিয়ে রাখতে পারেনি শিক্ষার্থী অনামিকা রায়কে। নানা প্রতিকূলতা আর দারিদ্র্যকে সঙ্গী করেও এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে সে। ভবিষ্যতে পড়াশোনা শেষ করে একজন শিক্ষক হওয়াই তার স্বপ্ন।

অনামিকার জন্মের পাঁচ বছর পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। এরপর থেকেই তার দুই পা হাঁটুর নিচ থেকে বেঁকে যায় হাঁটতে তাকে অনেক কষ্ট করতে হয়, কথা বলতেও জড়তা রয়েছে। তবুও শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে হার মানিয়ে সে এগিয়ে চলেছে শিক্ষার পথে।

চলতি শিক্ষাবর্ষে ফুলবাড়ী উপজেলা কাশিপুর কলেজের ডিজিটাল টেকনোলজি অ্যান্ড বিজনেস শাখার শিক্ষার্থী অনামিকা উপজেলার বোয়াইলভীর টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের ভেন্যু কেন্দ্র রাবাইতাড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। এর আগে ২০২৪ সালে গাগলা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-২.৭২ অর্জন করে।

পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত সময়ের আগেই সে উপস্থিত হয়েছে। পরীক্ষা শুরু হলে এক হাতে কলম চালানোর পাশাপাশি কাঁপতে থাকে তার পুরো শরীর। শরীর ঝুঁকিয়ে ধীরে ধীরে লিখে যায় প্রতিটি উত্তর। কথা বলতে গেলেও জড়িয়ে যায় জিহ্বা, তবু চোখেমুখে ছিল আত্মবিশ্বাস আর স্বপ্ন পূরণের দৃঢ় প্রত্যয়।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার গাগলা ইউনিয়নের ব্যাঙের দোলা গ্রামের বাসিন্দা অনামিকা শুধু শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গেই নয়, লড়ছে চরম দারিদ্র্যের সঙ্গেও। তার বাবা শ্রী অনিল চন্দ্র একজন প্রান্তিক কৃষক এবং মা কাঞ্চনমালা। চার মেয়ে ও তিন ছেলের সংসারে অনামিকা সবার ছোট। তার একটি ছোট ভাইও শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী।

পরিবারের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। মেয়েদের বিয়ে দিতে গিয়ে প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন বাবা। বসতভিটাসহ মাত্র ২৪ শতক জমি রয়েছে। সেই সামান্য জমির আয়েই কোনোমতে সংসার চলে। সংসারের ব্যয় মেটাতে বাবাকে বাড়তি কাজও করতে হয়।

অনামিকা জানায়, উপযুক্ত সহযোগিতা পেলে সে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায় এবং ভবিষ্যতে একজন শিক্ষক হয়ে সমাজে অবদান রাখতে চায়।

অনামিকার বাবা অনিল চন্দ্র বলেন, "অভাব-অনটনের কারণে মেয়েকে বড় চিকিৎসকের কাছে নিতে পারিনি। তবে তার লেখাপড়া যেন বন্ধ না হয়, সে জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। আমি চাই, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনোই তার স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়াক। কেউ যেন তাকে সমাজের বোঝা মনে না করে, বরং নিজের যোগ্যতায় সে একদিন প্রতিষ্ঠিত হোক।

কাশিপুর ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক আব্দুল আলিম বলেন, অনামিকা অত্যন্ত মেধাবী, অধ্যবসায়ী ও আত্মবিশ্বাসী শিক্ষার্থী। প্রতিকূলতাকে জয় করে সে আজ এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। আমরা বিশ্বাস করি, সে ভালো ফলাফল অর্জন করবে। শিক্ষক হিসেবে আমরা সবসময় তার পাশে আছি।

বোয়ালভীর বিএমটি কলেজ কেন্দ্রের সচিব ও অধ্যক্ষ আব্দুর রহিম বলেন, "শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সময় দেওয়ার বিধান রয়েছে। অনামিকাও সেই সুবিধা পাবে। আমার বিশ্বাস, এমন শিক্ষার্থীদের যথাযথ সহযোগিতা ও উৎসাহ দেওয়া হলে তারা নিজেদের মেধা ও কর্মদক্ষতার মাধ্যমে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।

আজ বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) অনুষ্ঠিত এইচএসসি ও আলিম পরীক্ষায় ফুলবাড়ী উপজেলার ফুলবাড়ী ডিগ্রি কলেজ, ফুলবাড়ী মহিলা ডিগ্রি কলেজ, সাইফুর রহমান সরকারি কলেজ, বোয়াইলভীর টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ এবং শাহবাজার আবুল হোসেন সিনিয়র (কামিল) মাদ্রাসা কেন্দ্রে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১ হাজার ১১১ জন। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ১ হাজার ৭৪ জন এবং অনুপস্থিত ছিল ৩১ জন।

আই/এ

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন