ফের ইরানে মার্কিন হামলা, হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা
হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন দফায় বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরান, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
রোববার (১২ জুলাই) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি নিউজের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে এটি ইরানের বিরুদ্ধে তাদের তৃতীয় দফার সামরিক অভিযান। তাদের দাবি, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সাইপ্রাসের পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর পরই এই হামলা চালানো হয়।
সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, এমভি জিএফএস গ্যালাক্সি নামের জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলার পর জাহাজটি চলাচল অক্ষম হয়ে পড়ে এবং একজন নাবিক নিখোঁজ হন।
যুক্তরাজ্যের ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, পরিস্থিতির কারণে জাহাজের নাবিকরা লাইফবোটে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
এক বিবৃতিতে সেন্টকম দাবি করেছে, আগের হামলার পর সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) মেনে চলার জন্য ইরানকে আরেকটি সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তেহরান তা লঙ্ঘন করায় নতুন করে সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, “ইরান ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন তাদের এর মূল্য দিতে হবে।”
অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, অনুমোদিত নৌপথ থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করায় একটি জাহাজ লক্ষ্য করে নৌবাহিনী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও সতর্কতামূলক গুলি ছোড়ে। এরপর আইআরজিসি হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে।
আইআরজিসি সতর্ক করে বলেছে, প্রণালি বন্ধের জেরে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সামরিক পদক্ষেপ নিলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে এবং এ অঞ্চলে থাকা নতুন মার্কিন ঘাঁটিগুলোও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
এর আগে চলতি সপ্তাহে ওমান উপকূলসংলগ্ন যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত নৌপথ দিয়ে চলাচলকারী তিনটি তেলবাহী জাহাজেও হামলার ঘটনা ঘটে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, তাদের নিয়ন্ত্রিত নৌপথই এ অঞ্চলের একমাত্র নিরাপদ রুট।
ইরানের কর্মকর্তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলায় ১৭ জন নিহত এবং ১১৫ জন আহত হয়েছেন। এর জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
পাল্টাপাল্টি হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে কার্যত যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে। তবে তিনি একই সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছেন এবং মধ্যস্থতাকারীরা সমঝোতা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছেন বলে উল্লেখ করেন।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অভিযোগ করেছেন, যুদ্ধবিরতির শর্ত প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রই লঙ্ঘন করেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে, তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনাটি ছিল ভুলবশত এবং এর জন্য একটি ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী’ দায়ী।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তেহরানের কাছে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে যে, হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক জাহাজে আর কোনো হামলা চালানো হবে না।
এ পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম প্রকাশ্য ভাষণে প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত বক্তব্যে তিনি বলেন, “শহীদ নেতা এবং সাম্প্রতিক সংঘাতে নিহত সব শহীদের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়া জাতির ইচ্ছা। আমরা সেই প্রতিশোধ নেবই।”
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। পরে তাকে নিজ শহর মাশহাদে দাফন করা হয়।
এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, তাকে হত্যার যেকোনো প্রচেষ্টার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক’ সামরিক অভিযান চালাবে।
এমএ//