আন্তর্জাতিক

ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ

দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র এক বছর পর ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া সিভিরিদেঙ্কোর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছে দেশটির পার্লামেন্ট। তবে এখনো নতুন প্রধানমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করেননি প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ফলে হঠাৎ এই মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী আইনপ্রণেতারা।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) পার্লামেন্টে ৪০ বছর বয়সী অর্থনীতিবিদ ইউলিয়া সিভিরিদেঙ্কোর পদত্যাগপত্র অনুমোদন করা হয়। কিন্তু তার উত্তরসূরি কে হবেন, সে বিষয়ে জেলেনস্কির নীরবতায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। কয়েকজন আইনপ্রণেতার মতে, সরকারে এই পরিবর্তনের লক্ষ্য এখনো স্পষ্ট নয়।

পার্লামেন্টে বিদায়ী বক্তব্যে ইউলিয়া সিভিরিদেঙ্কো বলেন, চলতি বছরের প্রতিটি দিনই কঠিন সিদ্ধান্ত ও দৃঢ় পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে। দায়িত্ব পালনের পুরো সময়ে যারা তার প্রতি আস্থা ও সমর্থন রেখেছেন, তাদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, তার কাছে সব সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কাজের ফলাফল।

সাদা পোশাক পরে দেওয়া ওই বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আসন্ন শীতকাল। কারণ রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা ও গ্যাস অবকাঠামোর ওপর হামলা আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

বিরোধী আইনপ্রণেতা ওলেক্সি হনচারেঙ্কো বলেন, সরকারকে কেন বিদায় দেওয়া হচ্ছে, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারছেন না। একই ধরনের মন্তব্য করেন আরেক বিরোধী আইনপ্রণেতা কিরা রুদিক। তার মতে, নতুন সরকার আগের সরকারের তুলনায় খুব ভিন্নভাবে কাজ করবে— এমন প্রত্যাশার তেমন কোনো কারণ নেই।

ইউলিয়া সিভিরিদেঙ্কোর দায়িত্বকালে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। যদিও তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি।

তবে সমালোচকদের দাবি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি প্রয়োজনীয় কঠোর অবস্থান নেননি।

বিরোধী দল হলোসের আইনপ্রণেতা ইয়ারোস্লাভ ঝেলেজনিয়াক বিদায়ী সরকারের সমালোচনা করে বলেন, জনগণকে প্রতিদিন ফলাফলের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। বাস্তবে প্রতিদিন দেখা গেছে নতুন উপস্থাপনা, নতুন সম্মেলন এবং দুর্নীতির মামলায় নতুন নতুন সন্দেহভাজনের নাম।

আইনপ্রণেতাদের ধারণা, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল ও গ্যাস কোম্পানি নাফতোগ্যাসের প্রধান সেরহি কোরেৎসকিই নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেতে পারেন। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।

মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের ঘোষণা দেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি সেরহি কোরেৎসকি এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভের সঙ্গে বৈঠক করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি ফেদোরভকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তবে সেটি হবে বড় ধরনের পরিবর্তন। কারণ, চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে রাশিয়ার অভ্যন্তরে দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতা বাড়ানোর কৌশলে কিয়েভ বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছে।

ইউক্রেনে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব মূলত অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যুদ্ধকালীন অর্থনীতি পরিচালনা, রুশ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং পশ্চিমা দাতাদের চাওয়া অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের দায়িত্বও প্রধানমন্ত্রীর ওপর বর্তায়।

ইউলিয়া সিভিরিদেঙ্কোর মেয়াদকালে ইউক্রেনকে একটি কঠিন শীত মোকাবিলা করতে হয়েছে। রাশিয়ার ধারাবাহিক হামলায় জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সাধারণ মানুষের জন্য বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা চালিয়েছে সরকার। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক সামাল দেওয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের লক্ষ্যে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার কাজও চলেছে।

যুদ্ধ চলাকালে নির্বাচন স্থগিত থাকায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনই প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির অন্যতম কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে কিয়েভভিত্তিক ইউরোপিয়ান পলিসি ইনস্টিটিউটের নীতিবিষয়ক ফেলো লেসিয়া বিদোচকোর মতে, এই ধরনের রদবদল প্রেসিডেন্টকেন্দ্রিক অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতাকেই সামনে নিয়ে আসে।

তার মতে, যুদ্ধের শুরুর দিকে এই ব্যবস্থা কার্যকর থাকলেও সময়ের সঙ্গে এর সক্ষমতা কমতে শুরু করেছে।

তিনি বলেন, প্রকৃত মূল্যায়ন হবে নতুন মন্ত্রী নিয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাদের কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রেসিডেন্ট পর্যাপ্ত স্বাধীনতা ও ক্ষমতা অর্পণ করেন কি না, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

এর আগেও মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের সময় একই ব্যক্তিদের ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্বে বসিয়েছেন জেলেনস্কি। ইউলিয়া সিভিরিদেঙ্কোর পূর্বসূরি ড্যানিস শিমহাল প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়ার পর প্রথমে প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং পরে জ্বালানিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন