এই ক্ষত সারতে সময় লাগবে: মেসি
ফুটবল ইতিহাসে লিওনেল মেসির নাম উচ্চারিত হবে অসংখ্য ট্রফি, রেকর্ড আর অবিস্মরণীয় মুহূর্তের সঙ্গে। কিন্তু সবচেয়ে বড় তারকারাও কখনো কখনো এমন এক পরাজয়ের মুখোমুখি হন, যার ব্যথা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পর সেই কষ্টই যেন ফুটে উঠেছে আর্জেন্টাইন অধিনায়কের প্রতিটি কথায়।
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রোববার (১৯ জুলাই) অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে হেরে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে যায় আর্জেন্টিনার। শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মেসি। টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার হতাশা স্পষ্ট ছিল তার চোখেমুখে। অনেকের ধারণা, এটিই হয়তো বিশ্বকাপে মেসির শেষ ম্যাচ। যদিও তিনি নিজে এখনো এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেননি।

ফাইনালের একদিন পর সোমবার রাতে ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে মেসি স্পেনকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার অভিনন্দন জানান। নিজের গলায় রানার্সআপের রৌপ্য পদক ঝুলিয়ে তোলা একটি ছবির সঙ্গে তিনি লেখেন, "এই কষ্ট অনেক গভীর। এই ক্ষত সারতে সময় লাগবে।"
তবে হারের বেদনাতেই আটকে থাকতে চান না আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। পুরো আসরের ইতিবাচক মুহূর্তগুলোও স্মরণ করেছেন তিনি।
মেসি বলেন, "আমি সেই ম্যাচগুলোর কথা মনে রাখতে চাই, যেগুলো আমরা শেষ পর্যন্ত লড়ে ঘুরিয়ে দিয়েছি। সেই মুহূর্তগুলো আমাদের স্মৃতিতে চিরদিন থাকবে। দেশের মানুষের সমর্থন, দলের কঠোর পরিশ্রম আর আত্মনিবেদন আমাদের আবারও বিশ্বের সেরাদের কাতারে ফিরিয়ে এনেছে।"
আর্জেন্টাইন অধিনায়কের বিশ্বাস, সময়ের ব্যবধানে এই বিশ্বকাপকে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করা হবে। কারণ খুব কম দলই টানা দুটি বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিতে পারে।
তার ভাষায়, "এই মুহূর্তে হয়তো আমাদের অর্জনের মূল্য বোঝা কঠিন। কিন্তু এই দল টানা দুটি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছে, যা নিঃসন্দেহে বড় একটি সাফল্য।"

২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন মেসি। চার বছর পর উত্তর আমেরিকার মাটিতেও দুর্দান্ত ফুটবল খেলেছে আর্জেন্টিনা। সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে উঠলেও স্পেনের সংগঠিত রক্ষণভাগের সামনে নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারেনি স্কালোনির দল। পুরো ম্যাচে লক্ষ্যভেদী কোনো শটই নিতে পারেনি বর্তমান রানার্সআপরা।
এই বিশ্বকাপ চলাকালেই ৩৯ বছরে পা দিয়েছেন মেসি। ২০৩০ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোতে। তখন তার বয়স হবে ৪৩ বছর। ফলে সেটিই কি হবে তার শেষ বিশ্বকাপ, নাকি ২০২৬-ই শেষ অধ্যায়—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। মেসিও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বার্তায় মেসি লেখেন, "হৃদয়ের গভীর থেকে সবাইকে ধন্যবাদ। আপনাদের প্রতিটি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসার বার্তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আবারও আমরা একটি জাতি হিসেবে এক হয়েছি। আর্জেন্টাইন হওয়ার গর্ব সবাই মিলে অনুভব করেছি। একই সঙ্গে বিশ্বকাপ জয়ের জন্য স্পেনকে অভিনন্দন জানাই।"
বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত অর্জনও কম নয় মেসির। টুর্নামেন্টের শুরুতেই তিনি জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসের ১৬ বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ড ভেঙে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২১। যদিও পরে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে ২২ গোল করে সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যান। গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও এগিয়ে থাকেন এমবাপ্পে। তিনি করেন ১০ গোল, আর মেসির নামের পাশে যোগ হয় ৮টি গোল।
বিশ্বকাপের ক্লান্তি কাটাতে এখন কিছুটা বিশ্রাম নিচ্ছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
ইএসপিএনের তথ্য অনুযায়ী, ইন্টার মায়ামির হয়ে পরবর্তী দুটি নিয়মিত লিগ ম্যাচ এবং এমএলএস অল-স্টার ম্যাচে খেলবেন না তিনি। একই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার জাতীয় দল ও ক্লাব সতীর্থ রদ্রিগো দে পলও।
বিশ্বকাপের ট্রফি এবার মেসির হাতে ওঠেনি। কিন্তু পরাজয়ের পরও তার বার্তায় ছিল না কোনো অভিযোগ, ছিল না হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ। ছিল কেবল কৃতজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাস এবং আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য প্রত্যয়। হয়তো এ কারণেই লিওনেল মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন, কোটি মানুষের অনুপ্রেরণারও নাম।
এসি//