চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন গ্রেফতার
চট্টগ্রামের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দিবাগত রাতে যশোরের ধুমধুমপুর এলাকা থেকে যৌথ অভিযানে তাকে আটক করা হয়। পরে তাকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ধুমধুমপুর এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে অভিযান চালানো হয়। এতে যশোর ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের যৌথ অভিযানে ডেভিড ইমনকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়।
সম্প্রতি চট্টগ্রামে একের পর এক চাঁদাবাজি, সশস্ত্র হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আলোচনায় আসে ডেভিড ইমনের নাম। গত ১৩ জুলাই চট্টগ্রামের একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে দুই দিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা না পেয়ে তার নির্দেশে চন্দনপুরায় ওই প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে সশস্ত্র হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ওই হামলায় ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী প্রায় ৩০ জন সন্ত্রাসী অংশ নেয়। গত দুই বছরে সাতটি হত্যা মামলায় আসামি হয়েছেন ডেভিড ইমন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে চট্টগ্রামে ডেভিড ইমন নামে কাউকে তেমনভাবে চেনা হতো না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের গ্রুপে যুক্ত হয়ে অপরাধ জগতে পরিচিতি পান তিনি। ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকায় তার বাড়ি। কৃষক পরিবারের সন্তান ইমন অল্প বয়সেই কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
পরে সাজ্জাদ আলী খানের গ্রুপে যোগ দিয়ে একাধিক হত্যাকাণ্ডে জড়ানোর মাধ্যমে সংগঠনের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। বর্তমানে তিনি বড় সাজ্জাদের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে চট্টগ্রামে গ্রুপটির কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। ছোট সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন কারাগারে যাওয়ার পর মোবারক হোসেন ইমন এবং মোহাম্মদ রায়হান আলম পৃথকভাবে নগর ও জেলার কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেন।
পুলিশের তথ্যমতে, বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা, রাউজান ও হাটহাজারী এলাকায় এই চক্রের প্রভাব বেশি। এসব এলাকায় চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করে আসছিল তারা।
২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া হত্যা এবং একই বছরের ২৩ মে রাতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলায়ও ইমনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট আনিস ও মোহাম্মদ হাসান নামে দুজনকে ব্রাশফায়ারে হত্যার ঘটনাতেও তার নাম উঠে আসে।
সর্বশেষ চন্দনপুরায় ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন) কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় অন্তত ৩০ জন সন্ত্রাসী অংশ নেয়। পুলিশ জানিয়েছে, তাদের বেশিরভাগই মুখোশ পরা থাকায় পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে হামলার পর থেকেই ডেভিড ইমন ও তার সহযোগীদের গ্রেফতারে অভিযান শুরু হয়।
১৩ জুলাই ডিডিএন কার্যালয়ে হামলা ও প্রায় ৩৫ লাখ টাকার মালামাল লুটের ঘটনার পর একই দিন সন্ধ্যায় জিইসি মোড়ে অবস্থিত আরেকটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘নেট প্লাস’-এর কর্ণধার নেওয়াজ মোরশেদের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে কল করে চাঁদা দাবি করা হয়। নিজের পরিচয় ডেভিড ইমন বলে দাবি করা ব্যক্তি টাকা না দিলে একই পরিণতির হুমকি দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে চট্টগ্রামের অক্সিজেন, মুরাদপুর, জিইসি মোড়, বায়েজিদ বোস্তামী ও পাঁচলাইশ এলাকার বিভিন্ন ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দেড় কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেছে ডেভিড ইমনের বাহিনী। নিরাপত্তার শঙ্কায় অনেক প্রতিষ্ঠানই প্রতিবাদ না করে চাঁদা দিতে বাধ্য হয়েছে বলেও জানা গেছে।
এদিকে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) চট্টগ্রাম বিভাগ। ১৪ জুলাই চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির আহ্বায়ক রাজিব শাহরিয়ার বলেন, চাঁদার দাবিতে হামলা, ভাঙচুর ও হুমকির ঘটনা এখন উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। তিনি ডেভিড ইমন ও তার বাহিনীর সদস্যদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান।
এসি//