বাবার অপমান সহ্য করতে না পেরে নববধূর আত্মহত্যা
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে মোবাইল চুরির অভিযোগে বাবা-মাকে মারধর ও লাঞ্ছিত করায় সুখতারা (১৮) নামে এক নববধূ আত্মহত্যা করেছেন। মাত্র ১২ দিন আগে ওই নববধূর বিয়ে হয়।
রোববার (৩০ আগস্ট) উপজেলার শিমুলবাড়ী ইউনিয়নের চর জ্যোতিন্দ্র নারায়ণ গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। আজ (৩১ আগস্ট) শিমুলবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল সন্ধ্যা ৭টার দিকে মেলা দেখা শেষে বাবা ও মেয়ে অটোরিকশাযোগে বোর্ডেরহাট বাজারে পৌঁছামাত্রই আলআমিন নামের এক যুবক অটোরিকশা থেকে সুখতারার সুলতানকে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে নামায়। এরপর তাকে ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে নিয়ে গিয়ে মোবাইল চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কথা-কাটাকাটি এক পর্যায়ে মারধরসহ লাঞ্ছিত করা হয়। এ সময় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ে সুখতারা বাবার এই লাঞ্ছনা সহ্য করতে না পেরে আমিনসহ ঘটনাস্থলে থাকা সবার কাছে বাবাকে বাঁচানো আকুতি জানায়। কিন্তু সেখানে থাকা কারও মন গলেনি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, প্রকাশ্য বাজারে ও নিজের মেয়ের সামনে এমন মর্মান্তিক অপমান ও লাঞ্ছনা মেনে নিতে পারেননি তার মেয়ে। পরে কিছুক্ষণ পরে জানতে পারেন ক্ষোভ ও অভিমানে সুলতানের মেয়ে আত্মহত্যা করেন। মেয়ে আত্মহত্যার খবর বাজারে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়ে।
সুলতানের বৃদ্ধ মা সুফিয়া বেওয়া বলেন, কয়েক দিন আগে আমার ছেলে অন্য এক জনের কাছ থেকে ৩০০ টাকা দিয়ে মোবাইল ফোনটি কিনেছিলেন। গতকাল বিকালে নাতনির নৌকা খেলা দেখার আবদার পুরণ করতে আমার ছেলে, নাতনিকে নিয়ে যায়। সন্ধ্যা ৭ টার দিকে খেলা দেখে বাড়িতে আসার পথে বোডেরহাট বাজারে আলআমিন ও নজরুল মোবাইল চুরির অপবাদে বাজারের মধ্যে ছেলে ও নাতনিকে মারপিট করে।
তিনি আরও জানান, প্রকাশ্যে অপমান ও মারধর করতে দেখে মেয়ে সুখতারা বাবাকে উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়ে কান্ন করতে করতে বাড়িতে এসে তাকে বিষয়টি জানায়। তিনি দৌড়ে বাজারে গিয়ে তাদের অনুরোধ করি, আমার ছেলের দোষ থাকলে পুলিশে দেন। এভাবে মারতে পারেন না। তার ছেলে মোবাইলটি তোতার কাছে কেনেন। ছেলেকে উদ্ধার করতে না পেরে বাড়ি ফিরে তিনি দেখেন সুখতারা আত্মহত্যা করেছে।
এদিকে মেয়ের মৃত্যুর পর মেয়ে বাবা সুলতান সোমবার বিকাল পর্যন্ত বাড়িতে ফিরেনি। সুলতানের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টিও পরিবারে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আকবর আলী, মরিয়ম বেগম, নুর হোসেন, সকিনা ও আলতাফ হোসেন জানান, সুলতান আহমেদ দিনমজুরি করে কষ্টে সংসার চালান। অনেক কষ্টে মাত্র ১২ দিন আগে মেয়ে সুখতারার বিয়ে দিয়েছিলেন। এমন একটি ঘটনায় পরিবারের সবাই ভেঙে পড়েছেন। তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
শিমুলবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম সোহেল বলেন, “সুলতান আহমেদ মেয়েকে নিয়ে বাজারে গেলে আল-আমিন নামে এক যুবক মোবাইল ফোনটি নিজের বলে দাবি করেন। এ নিয়ে তাকে মারধর ও অপমান করার ঘটনা ঘটে বলে জানতে পারি। এরপর মেয়েটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং বাড়িতে গিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা খবর পাই। তার বাড়িতে গিয়ে জানতে পারি মাত্র ১২ দিন আগে তার বিয়ে হয়েছিল। বলার ভাষা নেই।
ফুলবাড়ী থানার সেকেন্ড অফিসার ও তদন্তকারী কর্মকর্তা মনজুরুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে গতকাল রাত সাড়ে ৯টার দিকে মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। আজ সকাল সাড়ে ১১ টায় ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ কুড়িগ্রাম মর্গে পাঠানো হয়েছে। মেয়ের বাবা বাড়িতে না থাকায় এ ঘটনায় নিহতের চাচা ময়েন উদ্দিন বাদী হয়ে রাতে একটি ইউডি মামলা করেছেন।
তিনি আরও জানান, মোবাইল ফোন নিয়ে মারধরের ঘটনার সঙ্গে মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আই/এ