বিনোদন

কবর খুঁড়ে মৃত্যুর অপেক্ষায় জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা!

রুপালি পর্দায় হাসিয়েছেন অসংখ্য দর্শককে। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনা, পরিচালনা ও সিনেমা প্রদর্শনের সঙ্গেও কেটেছে জীবনের দীর্ঘ সময়। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে সেই পরিচিত জগত থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নাদির খান।

নানা শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন প্রবীণ এই অভিনেতা। এখন আর ক্যামেরার সামনে ফিরতে চান না তিনি। জীবনের বাকি সময়টা মহান আল্লাহর ইবাদতে কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নাদির খান।

আর মৃত্যুর পর কোথায় তার শেষ ঠিকানা হবে, সেই সিদ্ধান্তও অনেক আগেই নিয়ে রেখেছেন তিনি। প্রায় ২০ বছর আগে ঢাকার রায়ের বাজারের প্রেমতলায় নিজের জন্য একটি কবরের জায়গা নির্ধারণ করেন এই অভিনেতা। এখন মাঝেমধ্যেই সেখানে যান তিনি। নিজের জন্য রাখা সেই কবর নিজ হাতেই পরিষ্কার করেন, পরম যত্নে দেখভাল করেন শেষ শয্যার স্থানটি।

বিষয়টি সিনেমার কোনো দৃশ্যের মতো মনে হলেও নাদির খানের জীবনে এটি একেবারেই বাস্তব। নিজের নির্ধারিত কবরের পাশে দাঁড়িয়েই তিনি যেন জীবনের শেষ অধ্যায়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছেন।

নাদির খান বলেন, মৃত্যুর পর ওই কবরেই সমাহিত হতে চান তিনি। সেখানে দাঁড়ালে তার মধ্যে এক ধরনের ভালো লাগা কাজ করে। মৃত্যুকে তিনি ভয় পান না। মহান আল্লাহ ও রাসুলকে (সা.) যারা ভালোবাসেন, তাদের কাছে মৃত্যু ভয়ের বিষয় হতে পারে না বলেও মনে করেন তিনি।

তবে মৃত্যুর পর নিজের কবরকে কোনোভাবেই মাজারে পরিণত না করার অনুরোধ জানিয়েছেন নাদির খান। তিনি নিজেকে কোনো সাধক বা পীর-ফকির হিসেবে দেখেন না। তার পরিচয় একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেই।

নাদির খান বলেন, যারা তাকে ভালোবাসেন, তারা যেন মৃত্যুর পর তার কবর জিয়ারত করেন এবং তার জন্য দোয়া করেন—এটাই তার প্রত্যাশা।

নিজের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে চলচ্চিত্র জীবনকেও বিদায় জানিয়েছেন এই অভিনেতা। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে জেনে-না জেনে যেসব ভুল করেছেন, সেসবের জন্য চলচ্চিত্র অঙ্গনের সহকর্মী এবং দেশবাসীর কাছেও ক্ষমা চেয়েছেন তিনি।

নাদির খানের স্পষ্ট সিদ্ধান্ত—আর অভিনয়ে ফিরবেন না। জীবনের বাকি দিনগুলো মহান আল্লাহর ইবাদত করেই কাটাতে চান তিনি।

মায়ের দোয়াকেই জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন মনে করেন

ব্যক্তিজীবনে নাদির খান মায়ের প্রতি গভীর অনুরক্ত। তার কাছে মায়ের ভালোবাসার চেয়ে বড় কোনো ধর্ম নেই। জীবনে যা কিছু পেয়েছেন, সবই মায়ের দোয়ার ফল বলে মনে করেন তিনি।

নাদির খান বলেন, এখনো মায়ের দোয়াতেই বেঁচে আছেন তিনি। পৃথিবীতে মায়ের প্রতি ভালোবাসাকেই নিজের কাছে সবচেয়ে বড় ধর্ম মনে করেন। পরকালেও মায়ের সঙ্গে আবার দেখা হবে—এমন বিশ্বাসও ধারণ করেন তিনি।

শেষবারের মতো ফিরতে চান এফডিসিতে

জীবনের শেষ ইচ্ছাগুলোর মধ্যে বিশেষ জায়গা দখল করে আছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন—এফডিসি। মৃত্যুর পর তার মরদেহ প্রথমে প্রিয় কর্মস্থল এফডিসিতে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন নাদির খান।

যৌবনের সোনালি সময়ের বড় একটি অংশ এফডিসিতে কাটিয়েছেন তিনি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে যেসব সহকর্মীর সঙ্গে কাজ করেছেন, মৃত্যুর পর তাদের সামনে শেষবারের মতো যেতে চান এই অভিনেতা।

নাদির খানের ইচ্ছা, এফডিসিতে তার সহকর্মী ও চলচ্চিত্র পরিবারের সদস্যরা যেন শেষবারের মতো তাকে দেখতে পারেন। একই সঙ্গে তার জানাজায় অংশ নিয়ে আত্মার মাগফিরাতের জন্য দোয়া করেন সবাই।

সাড়ে তিনশ সিনেমায় অভিনয়

১৯৫২ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকার রায়ের বাজারে জন্ম নাদির খানের। তার নিজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবনে প্রায় সাড়ে তিনশ সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি।

তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘কসাই’, ‘উপহার’, ‘চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা’, ‘জংলী রানী’, ‘মনিহার’, ‘দিলদার আলী’, ‘বেদের মেয়ে জোছনা’, ‘অমানুষ’, ‘আবদুল্লাহ’, ‘রঙিন রসের বাইদানী’, ‘ইতিহাস’ ও ‘কাবুলিওয়ালা’।

অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক হিসেবেও কাজ করেছেন নাদির খান। তার উল্লেখযোগ্য প্রযোজিত চলচ্চিত্র হলো ‘গরীবের বিচার নাই’, ‘রঙিন রসের বাইদানী’, ‘আখেরী জবাব’, ‘আবদুল্লাহ’ ও ‘স্বামী হারা সুন্দরী’।

‘স্বামী হারা সুন্দরী’ চলচ্চিত্রটি পরিচালনাও করেছেন তিনি।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলচ্চিত্রের নানা ভূমিকায় যুক্ত থাকা নাদির খান এখন সেই বর্ণিল অধ্যায় পেছনে ফেলে জীবনের শেষ সময়টুকু ইবাদত ও আত্মিক প্রশান্তির মধ্য দিয়ে কাটাতে চান। নিজের কবরের জায়গা আগেই নির্ধারণ করে রাখা এবং শেষবারের মতো এফডিসিতে ফিরতে চাওয়ার ইচ্ছায় যেন ফুটে উঠেছে তার জীবনের দীর্ঘ চলচ্চিত্রযাত্রার এক আবেগঘন সমাপ্তির ছবি।

 

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন