আন্তর্জাতিক

ভারত থেকে ফেরার সময় পুতিনের সঙ্গে যাবে ‘মল-মূত্র’!

ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে তিন দিনের সফরে ভারতে রয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রোববার (১৩ সেপ্টম্বর) সম্মেলন শেষে তার রাশিয়ায় ফেরার কথা রয়েছে। তবে পুতিনের বিদেশ সফর ঘিরে শুধু দৃশ্যমান নিরাপত্তাব্যবস্থাই নয়, তাঁর ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ও শারীরিক অবস্থার তথ্য গোপন রাখতেও নেওয়া হয় বিশেষ কিছু ব্যবস্থা। এর মধ্যে সফর শেষে তার মলমূত্র পর্যন্ত রাশিয়ায় ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য এক্সপ্রেস ইউএস’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশ সফরের সময় পুতিনের মলমূত্র সংগ্রহ করে রাশিয়ায় নিয়ে যান তার দেহরক্ষীরা। মূল উদ্দেশ্য হলো, তার স্বাস্থ্য ও শারীরিক অবস্থার কোনো তথ্য যেন বিদেশি কোনো পক্ষের হাতে না যায়। এ জন্য বিশেষ একটি স্যুটকেসে তার মানববর্জ্য সংগ্রহ করে রাখা হয় এবং পরে তা রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুতিনের নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে প্রায়ই আলোচনায় আসে ‘চেগেট’ নামের পারমাণবিক কমান্ড ব্রিফকেসও। এটি রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্রিফকেসটি প্রেসিডেন্টের কাছাকাছি রাখা হয় এবং প্রয়োজন হলে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পুতিন তার নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কঠোর করেছেন। তার আশপাশে দায়িত্ব পালনকারী কর্মীদের মুঠোফোন ব্যবহারের অনুমতি নেই। তাদের মাস্ক পরতে হয় এবং পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাতের আগে হাতঘড়িও খুলে রাখতে হয়।

পুতিনের প্রতিটি বিদেশ সফরেই থাকে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা।

রাশিয়ার অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ডসিয়ার সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, রুশ প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ বাহিনী হিসেবে কাজ করে রুশ প্রেসিডেন্সিয়াল নিরাপত্তা পরিষেবা। সংক্ষেপে এই বাহিনীকে এসবিপি বলা হয়। এটি রাশিয়ার ফেডারেল সুরক্ষা পরিষেবার অধীনে পরিচালিত হয়। এই নিরাপত্তাব্যবস্থার ঐতিহাসিক শিকড় সাবেক সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির সঙ্গে যুক্ত। পুতিন নিজেও একসময় কেজিবির কর্মকর্তা ছিলেন।

রাশিয়ার ফেডারেল সুরক্ষা পরিষেবায় প্রায় ৫০ হাজার কর্মী রয়েছে বলে ডসিয়ার সেন্টারের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এই সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে নিরাপত্তা দেওয়া গোপন পরিষেবার সদস্যসংখ্যার প্রায় ছয় গুণ। পুতিনকে ঘিরে সব সময় প্রায় ৩০ জন সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মী থাকেন। পাশাপাশি তার আশপাশে থাকা বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যেও নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে দায়িত্ব পালন করেন।

বিদেশ সফরের সময় পুতিনের নিরাপত্তাব্যবস্থা কয়েকটি স্তরে ভাগ করা থাকে বলে ইউরোপীয় গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রুশ প্রেসিডেন্টের মলমূত্র সংগ্রহের স্যুটকেস

সবচেয়ে ভেতরের স্তরে থাকেন পুতিনের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীরা। কালো পোশাক ও কানে যোগাযোগযন্ত্র নিয়ে তারা সব সময় রুশ প্রেসিডেন্টের কাছাকাছি অবস্থান করেন। দ্বিতীয় স্তরের নিরাপত্তাকর্মীরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে দায়িত্ব পালন করেন। তাদের পরিচয় ও কর্মকাণ্ড অত্যন্ত গোপন রাখা হয়।

তৃতীয় স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থার দায়িত্ব হলো পুতিনের আশপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা এবং অননুমোদিত ব্যক্তিদের তার কাছাকাছি যেতে না দেওয়া। আর সবচেয়ে বাইরের স্তরে থাকে দূরবর্তী নজরদারি ও সশস্ত্র নিরাপত্তাব্যবস্থা। উঁচু ভবনের ছাদসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান নিয়ে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকেন নিরাপত্তাকর্মীরা।

পুতিনের ভারত সফরেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তার দিল্লি পৌঁছানোর আগেই ভারত ও রাশিয়ার নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে বহুস্তরীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্সিয়াল নিরাপত্তা পরিষেবার সদস্যরা সবচেয়ে কাছের নিরাপত্তাবলয়ে রয়েছেন। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পুতিনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্বও তাদের ওপর।

এর পরের স্তরে রয়েছে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষী বাহিনীর কমান্ডোরা। সন্ত্রাসী হামলা বা বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত এই বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। আর নিরাপত্তাব্যবস্থার বাইরের অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে দিল্লি পুলিশ।

পুতিনের যাতায়াতের পথ, আশপাশের এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে জোরদার করা হয়েছে নজরদারি। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বিশেষ উড়ন্ত যন্ত্র, সংকেত-বাধাদান ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি এবং মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। তার গাড়িবহরের চলাচলের পথে উঁচু ভবনগুলোতেও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের তথ্য এসেছে।

পুতিনের স্থল নিরাপত্তায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি তার বিশেষ গাড়ি। ইউরোপীয় গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এটিকে ‘চলন্ত বাঙ্কার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্টের জন্য বিশেষভাবে তৈরি অরাস সেনাট মডেলের এই সুরক্ষিত গাড়িটি গুলি ও বিস্ফোরণের আঘাত প্রতিরোধে সক্ষম। এতে রয়েছে জরুরি অক্সিজেন সরবরাহ, ক্ষতিগ্রস্ত হলেও চলতে সক্ষম বিশেষ টায়ার, সুরক্ষিত যোগাযোগব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা।

গাড়িটির বায়ু পরিশোধনব্যবস্থা রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্রের হামলা থেকেও সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। টায়ার বা জানালার ক্ষতি হলেও গাড়িটি চলতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়েছে।

ডসিয়ার সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশ সফরে পুতিন সাধারণত ইলিউশিন আইএল-৯৬-৩০০পিইউ উড়োজাহাজ ব্যবহার করেন। রুশ গণমাধ্যমে বিমানটিকে ‘উড়ন্ত ক্রেমলিন’ বলা হয়। এতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা, সুরক্ষিত যোগাযোগকক্ষ এবং বিশেষ কমান্ড ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানা গেছে। এমনকি বিমানটি থেকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার সক্ষমতাও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

তবে নিরাপত্তার কারণে পুতিন কখনো একক উড়োজাহাজে ভ্রমণ করেন না বলে ডসিয়ার সেন্টারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই পথে এক বা একাধিক সহায়ক বিমানও চলাচল করে। এতে কোন বিমানে রুশ প্রেসিডেন্ট অবস্থান করছেন, তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

পুতিনের নিরাপত্তাব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তার খাদ্য ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সুরক্ষা। বিদেশ সফরে তার খাবার সফররত দেশের হোটেলের রান্নাঘরে প্রস্তুত করা হয় না বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার সঙ্গে থাকা রুশ রাঁধুনিরাই খাবার তৈরি করেন।

খাবার তৈরির সময় রাঁধুনিদের দস্তানা ব্যবহার করতে হয় এবং দিনে একাধিকবার পোশাক পরিবর্তনের নিয়ম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তাদের হাতে কোনো ক্ষত রয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হয়। পুতিনের খাবারের প্রতিটি উপাদান পরীক্ষা করার পর তা তার কাছে পৌঁছায়। এমনকি খাবারে বিষ মেশানো হয়েছে কি না নিশ্চিত করতে দেহরক্ষীদের কেউ কেউ আগে খাবার পরীক্ষা করে দেখেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আর সবচেয়ে আলোচিত নিরাপত্তাব্যবস্থাগুলোর একটি হলো পুতিনের মানববর্জ্য সংগ্রহ করে রাশিয়ায় ফিরিয়ে নেওয়া।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশ সফরে রুশ প্রেসিডেন্টের দেহরক্ষীরা বিশেষ স্যুটকেস সঙ্গে রাখেন। সফরের সময় তাঁর মলমূত্র সংগ্রহ করে সেই স্যুটকেসে রাখা হয় এবং পরে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়।

মূলত পুতিনের স্বাস্থ্য, শারীরিক অবস্থা ও গতিবিধি সম্পর্কে কোনো ধরনের তথ্য যেন বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা বা অন্য কোনো পক্ষের হাতে না পৌঁছায়, সে লক্ষ্যেই তার নিরাপত্তাব্যবস্থা এত কঠোর বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ভারত সফরেও এই নিরাপত্তাব্যবস্থার কঠোরতা অব্যাহত রয়েছে।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন