আন্তর্জাতিক

পাকিস্তানি হানিট্র্যাপে ১৮ ভারতীয় সেনা, সামনে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

ছবি: এআই ইমেজ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের সঙ্গে পরিচয়, এরপর বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতা। একপর্যায়ে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের পর শুরু হতো যৌন বার্তা, ছবি ও ভিডিও আদান-প্রদান। এই ঘনিষ্ঠতাকেই অস্ত্র বানিয়ে ভারতীয় নৌবাহিনীর সদস্যদের কাছ থেকে সংবেদনশীল সামরিক তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে ১৩ নৌসেনা সদস্যসহ মোট ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ভারতের অভিযোগ, পাকিস্তানি গোয়েন্দারা ভারতীয় নৌবাহিনীর ইস্টার্ন নেভাল কমান্ডকে লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া নারী পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে এই ফাঁদ পেতেছিল। প্রেমের ফাঁদ বা ‘হানিট্র্যাপ’-এর মাধ্যমে নৌসেনাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে ধীরে ধীরে তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা হতো।

ভারতের যৌথ বাহিনীর পরিচালিত ‘অপারেশন ফায়ারওয়াল ২০২৬’-এর আওতায় পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের এই নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়া যায় বলে জানা গেছে।

সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টের হাতে আসা তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথির বরাতে মঙ্গলবার (০৬ অক্টোবর) এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

নথি অনুযায়ী, অন্ধ্রপ্রদেশের কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, নেভি ইন্টেলিজেন্স এবং অ্যান্টি-টেরোরিজম স্কোয়াডের সমন্বিত তদন্তে পাকিস্তানি নারী গোয়েন্দাদের ছদ্মপরিচয়ে ভারতীয় নৌসেনাদের লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টি উঠে এসেছে।

তদন্তে জানা যায়, ‘জোশিতা পাল’ ও ‘অনভি মেহতা’ নামে দুটি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচয় ব্যবহার করতেন পাকিস্তানি নারী গোয়েন্দারা। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ভারতীয় নৌবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে প্রথমে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা হতো। একজন নিজেকে মুম্বাইয়ের একটি জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এবং অন্যজন দিল্লির একজন মনোবিজ্ঞানী হিসেবে পরিচয় দিতেন।

কয়েক মাস ধরে কথোপকথনের মাধ্যমে আস্থা ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরির পর নৌসেনাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা আদান-প্রদান থেকে হোয়াটসঅ্যাপের ভয়েস ও ভিডিও কলে নিয়ে যাওয়া হতো। এরপর বিভিন্ন কৌশলে তাদের কাছ থেকে সামরিক ও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হতো।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথিতে আরও বলা হয়েছে, এই ফাঁদে জড়িয়ে পড়া ভারতীয় নৌসেনাদের কেউ কেউ নিজেদের জাহাজ ও সাবমেরিনের সংখ্যা, চলাচলের গোপন সময়সূচি এবং সুরক্ষিত নৌঘাঁটির ভেতরের সরাসরি ভিডিও পর্যন্ত পাকিস্তানি নারী হ্যান্ডলারদের কাছে পাঠিয়েছেন।

তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি নৌসেনাদের হোয়াটসঅ্যাপের এককালীন পাসওয়ার্ড বা ওটিপিও হাতিয়ে নেওয়া হতো।

অভিযোগ রয়েছে, এসব ওটিপি ব্যবহার করে পাকিস্তান থেকে ভারতীয় মোবাইল নম্বরে অনুপ্রবেশ করা এবং পরে আরও নৌ কর্মকর্তা ও সেনাসদস্যকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হতো।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, সংবেদনশীল তথ্য ও ওটিপির বিনিময়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ দেওয়া হতো। অর্থের লেনদেনের মাধ্যমে নৌসেনাদের কাছ থেকে আরও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হয় বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।

প্রথম দিকে অন্ধ্রপ্রদেশের কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স ইউনিট মাত্র দুজনের সম্পৃক্ততার সন্দেহ করেছিল। তারা হলেন বিশাখাপত্তনমে কর্মরত নৌ কর্মকর্তা প্রদীপ মুখার্জি এবং নৌবাহিনীর চুক্তিভিত্তিক বেসামরিক চালক এ. সাই ভারাপ্রসাদ।

তাদের জিজ্ঞাসাবাদের পর তদন্তকারীরা পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তথ্য পাচারের অভিযোগে জড়িত ১৮ জনের একটি বড় নেটওয়ার্কের সন্ধান পান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ২ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া অভিযানে ভারতের ১০টি রাজ্য থেকে এখন পর্যন্ত ১৩ নৌসেনা সদস্যসহ মোট ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সরকারি গোপনীয়তা আইন এবং কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন ‘ইউএপিএ’-এর আওতায় মামলা করা হয়েছে।

অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশ জানিয়েছে, পুরো ঘটনার তদন্ত এখনো চলছে।

প্রদীপ মুখার্জি ও এ. সাই ভারাপ্রসাদকে আগামী ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত বিচার বিভাগীয় হেফাজতে রাখা হয়েছে। বর্তমানে তারা বিজয়ওয়াড়া জেলা কারাগারে রয়েছেন।

গত ২ ও ৪ অক্টোবর কোয়েম্বাটুর ও বিশাখাপত্তনমে প্রথম দফায় গ্রেপ্তার করা হয়। তবে বিশাখাপত্তনমসহ ভারতের বিভিন্ন এলাকার প্রতিরক্ষা স্থাপনা সম্পর্কিত তথ্য এনক্রিপ্ট করা যোগাযোগের মাধ্যমে পাচারের সন্দেহে অভ্যন্তরীণ তদন্ত সেপ্টেম্বরেই শুরু হয়েছিল।

তদন্তকারীদের নজরে আসে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে নৌসেনাদের আস্থায় নেওয়ার পর ধাপে ধাপে তাদের কাছ থেকে সামরিক তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছিল। পরে সেই তথ্য পাচার এবং অর্থ লেনদেনের সূত্র ধরে তদন্তের পরিধি বাড়ানো হয়। এখন এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখছে অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন