স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধ হওয়ায় বিক্ষোভে উত্তাল আজারবাইজান
আজারবাইজানে স্কুলে হিজাব পরার ওপর নতুন পোশাকবিধির মাধ্যমে বিধিনিষেধ আরোপের প্রতিবাদে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। হিজাব পরায় কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর প্রতিবাদে কোথাও ক্লাস বর্জন করেছেন শিক্ষার্থীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে প্রতিবাদ।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
গত মাসে আজারবাইজান সরকার স্কুলের পোশাকবিধিতে সংশোধনী অনুমোদন করে। এতে সরাসরি হিজাব নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়নি। তবে নতুন নিয়মে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পোশাক পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, এই বিধির ফলে স্কুলে হিজাব পরার ক্ষেত্রে কার্যত বাধা তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আজারবাইজান প্রেস এজেন্সি জানিয়েছে, সরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের পোশাকবিধি সংশোধনের উদ্দেশ্য হলো দেশের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পোশাকের ক্ষেত্রে অভিন্নতা নিশ্চিত করা।
আজারবাইজানের জনসংখ্যার প্রায় ৯৬ শতাংশ মুসলিম। তবে দেশটির সংবিধানে রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে ঘোষণা করার পাশাপাশি ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আজারবাইজানের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জাতীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রতিফলন রয়েছে—এমন পোশাক বিশেষ অনুষ্ঠানে পরার অনুমতি দেওয়া হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে শিক্ষা ও বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের অধীন শিক্ষাবিষয়ক পরিষদের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
শিক্ষকদের পোশাকও পেশাগত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত বলে উল্লেখ করেছে সংবাদ সংস্থাটি। এর মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক ভাবমূর্তি বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে।
তবে নতুন বিধির সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির কথা বলে হিজাব পরা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশে বাধা দেওয়া ধর্মীয় স্বাধীনতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নতুন পোশাকবিধির প্রতিবাদে আজারবাইজানের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচার চালানো হচ্ছে।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, হিজাব পরার কারণে স্কুলে প্রবেশে বাধার মুখে পড়া শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত দুটি স্কুলের শিক্ষার্থীরা নতুন নিয়মের প্রতিবাদে ক্লাস বর্জন করেছে।
শিক্ষিকা জাহরা হাসানোভা আলজাজিরাকে বলেন, তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে এখন থেকে স্কুলে হিজাব পরে আসতে পারবেন না তিনি।
এ ঘটনায় নিজের কষ্টের কথা জানিয়ে জাহরা বলেন, হিজাব পরা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। কেউ হিজাব খুলে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেও তা নিজের ইচ্ছাতেই হওয়া উচিত।
নতুন পোশাকবিধির প্রতিবাদ জানিয়েছেন কারাবন্দী সাংবাদিক পোলাদ আসলানভ। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ২০২০ সালে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর থেকে তিনি ১১৩ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। নতুন বিধির প্রতিবাদে তিনি অনশন শুরু করেছেন।
তার স্ত্রী গুলমিরা আসলানভা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় জানান, কারাগারে থেকেও সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদ করছেন আসলানভ। তার হাতে প্রতিবাদের একমাত্র উপায় অনশন।
এদিকে আজারবাইজানে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়লেও নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ওপেন অবজারভেটরি অব নেটওয়ার্ক ইন্টারফেরেন্স ও নেটব্লকসের তথ্য থেকে এ দাবির সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
আজারবাইজানের নতুন পোশাকবিধির বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া প্রতিবাদ তুরস্কেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ১৯৯৭ সালে তুরস্কের তথাকথিত ‘উত্তরাধুনিক অভ্যুত্থান’-পরবর্তী পরিস্থিতির তুলনা করছেন।
ওই সময় হিজাব পরা নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ ও ক্লাসে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া হয়েছিল। সরকারি চাকরিতে থাকা অনেক নারীকে বরখাস্ত করা হয় অথবা পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল।
গত সপ্তাহে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে আজারবাইজানের কনস্যুলেটের সামনে বিক্ষোভ করেন প্রতিবাদকারীরা। মুসলিম নারীদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের প্রতিবাদ জানিয়ে তারা বাকুর কর্তৃপক্ষকে নতুন সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
এদিকে তুরস্কের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও দেশটির সমালোচনা করেছেন আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ।
নিজের রাজনৈতিক দল নিউ আজারবাইজান পার্টির কংগ্রেসে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, আজারবাইজানের জীবনধারায় বাইরের কারও হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।
আজারবাইজানের ঘনিষ্ঠ মিত্র তুরস্কের সরকার আলিয়েভের বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি। তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান গত ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে বলেন, মুসলিম নারীরা ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
নতুন পোশাকবিধি নিয়ে আজারবাইজানে প্রতিবাদ অব্যাহত থাকায় ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের নীতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়ম এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার সীমা নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হচ্ছে।
এসি//