৩২ হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েও দিনে ১৪ ঘণ্টা কাজ করেন লুয়ানা
হঠাৎ করেই বিপুল সম্পদের মালিক হলে বদলে যেতে পারে মানুষের জীবনযাপন, শখ কিংবা দৈনন্দিন অভ্যাস। বিলাসবহুল বাড়ি, দামি গাড়ি আর আরাম-আয়েশের জীবনেও ঝুঁকতে পারেন অনেকে। কিন্তু বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ নারী বিলিয়নিয়ার লুয়ানা লোপেস লারার জীবন যেন সেই ধারণার উল্টো ছবি।
৩০ বছর বয়সী এই ব্রাজিলীয় উদ্যোক্তার আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ ২৬০ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৩২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এত বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার পরও তার দৈনন্দিন জীবনযাপনে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। এখনো দিনের ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করেন, ছুটিও নেওয়া হয় না নিয়মিত। তার মনোযোগের কেন্দ্রে রয়েছে নিজের গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান কালশিকে আরও এগিয়ে নেওয়া।
মার্কিন সাময়িকী ফরচুনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লুয়ানা জানান, কালশি গড়ে তোলার কাজে শুরু থেকেই তিনি পুরোপুরি নিবেদিত। এ কারণে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার পরও জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন অনুভব করেননি। তবে মাঝেমধ্যে ভালো খাবার খেতে একটু দামি রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন তিনি।
প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার আগে লুয়ানা ব্রাজিলে পেশাদার ব্যালেরিনা হওয়ার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা এই তরুণীর কাছে বিলিয়নিয়ার পরিচয় এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি। বন্ধুদের সঙ্গে ভালো খাবার খাওয়া কিংবা পরিবারকে নিয়ে ভ্যাটিকান সিটিতে বড়দিনের প্রার্থনায় অংশ নেওয়ার মতো কিছু বিশেষ অভিজ্ঞতা তার জীবনে এসেছে। কিন্তু বিলাসবহুল জীবনযাপন কিংবা দামি শখের পেছনে ছুটছেন না তিনি।
লুয়ানার কাছে ব্যক্তিগত সম্পদ বা প্রতিষ্ঠানের বাজারমূল্যই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। বরং এগুলোকে নিজের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে দেখেন তিনি। তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কালশির উন্নতি এবং প্রতিষ্ঠানটিকে আরও বড় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া।
ভবিষ্যৎ নিয়ে বাজি, কালশির ব্যবসা
লুয়ানার সহপ্রতিষ্ঠিত কালশি একটি ভবিষ্যদ্বাণীভিত্তিক বাজারের প্ল্যাটফর্ম। এখানে ব্যবহারকারীরা নির্বাচন, খেলাধুলা ও অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে, তা নিয়ে চুক্তি করতে পারেন। এসব চুক্তির মূল্য নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ঘটনার ফলাফলের ওপর।
প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্যও অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫ সালের জুনে কালশির মূল্যায়ন ছিল ২০০ কোটি ডলার। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে একই বছরের ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১০০ কোটি ডলারে। এরপর ২০২৬ সালের মে মাসে প্রতিষ্ঠানটির মূল্যায়ন ২ হাজার ২০০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।
গত সেপ্টেম্বর মাসে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৪ হাজার কোটি ডলার মূল্যায়নে আরও ১০০ কোটি ডলার তহবিল সংগ্রহের বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে কালশি। এই উদ্যোগ সফল হলে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য আরও বাড়তে পারে।
আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে কালশি
দ্রুত ব্যবসায়িক সম্প্রসারণের পাশাপাশি আইনি বিরোধেও জড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্য কালশির খেলাধুলাসংক্রান্ত চুক্তিগুলোকে অবৈধ জুয়া হিসেবে চ্যালেঞ্জ করেছে। এসব চুক্তি প্রচলিত জুয়ার ব্যবসার আওতায় পড়ে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
তবে কালশির অবস্থান ভিন্ন।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এটি প্রচলিত ক্রীড়াভিত্তিক বাজির প্রতিষ্ঠান নয়; বরং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রিত একটি আর্থিক বিনিময়মাধ্যম।
ফরচুন ডেইলিকে দেওয়া বক্তব্যে লুয়ানা বলেন, ‘আমরা কোনো স্পোর্টসবুকের মতো অর্থ উপার্জন করি না।’
লুয়ানার বিশ্বাস, ভবিষ্যদ্বাণীভিত্তিক বাজার মানুষকে নিজেদের অনুমানের পক্ষে আর্থিক অবস্থান নিতে উৎসাহিত করে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে আরও নির্ভুল পূর্বাভাস তৈরি করা সম্ভব।
এদিকে কালশির আরেক সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী তারেক মনসুর ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে চলমান আইনি বিরোধ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে, বিপুল সম্পদ ও দ্রুত ব্যবসায়িক সাফল্যের পরও লুয়ানা লোপেস লারার জীবনযাপনের মূল বৈশিষ্ট্য হয়ে আছে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও কাজের প্রতি একাগ্রতা। ব্যক্তিগত বিলাসের চেয়ে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়াকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ নারী বিলিয়নিয়ারদের একজন এই উদ্যোক্তা।
এসি//