Bayanno Tv
বৃহস্পতিবার, ০৬ মে ২০২১, ২৩ বৈশাখ ১৪২৭
×

হেফাজত নেতা মামুনুল হককে নিয়ে যা বললেন তসলিমা নাসরিন

  বায়ান্ন ডেস্ক    ০৮ এপ্রিল ২০২১, ১৮:৩৯

মামুনুল হক

বাংলাদেশের একজন লেখিকা তসলিমা নাসরিন। যিনি বর্তমানে ভারতে রয়েছেন। সেখানেই বসবাস করছেন তসলিমা নাসরিন। বিভিন্ন লেখার জন্য তিনি আলোচিত-সমালোচিত হয়েছেন অনেকের কাছে। হেফাজত নেতা মামুনুল হককে তিনি তার ফেসবুকে বিশাল স্ট্যাটাস দিয়েছেন। পাঠকের জন্য তা হুবহু তুলে ধরা হলো।

নারায়ণগঞ্জের রিয়েল রিসোর্টে হেফাজতি নেতা মামুনুল হক নিজে যে আদর্শের কথা ওয়াজে মাহফিলে শোনান, সেই আদর্শের বাইরে কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়লেন কিছু তরুণের হাতে  এবং আল্লাহর কসম খেয়ে ডাহা মিখ্যে কথা বলতে লাগলেন --- এই খবর  সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ পাওয়ার  পর শত শত  মাদ্রাসার ছেলে  তাদের গুরু মামুনুল হককে উদ্ধার করতে গিয়ে  রিসোর্টের ভেতর রিসেপশান, রেস্তোরাঁ    যা পেয়েছে    ভেঙ্গে গুঁড়ো করে দিয়েছে। দেখে প্রশ্ন জাগছিল মনে,  মাদ্রাসার ছেলেরা এভাবে অন্যের সম্পত্তি ধ্বংস করার কায়দা  কোত্থেকে শিখেছে? হাতে ওদের এমন সব শক্ত লাঠি কে দিল?   এমন সব অস্ত্র, যেগুলো দিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই গোটা রিসোর্টের যাবতীয় জিনিসপত্র মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া যায়!   যারা রিসোর্টে ধ্বংসাত্মক কাজ করেছে,  যারা মামুনুল হককে মাথায় তুলে সম্মান দিয়েছে, তারা কি জানেনা মামুনুল হক  সেই কাজটিই করেছেন যে কাজটিকে  তিনি নিজেই    অনৈতিক, অবৈধ, অন্যায়  বলেন? তারা কি জানে না, আল্লাহর কসম কেটে তাদের গুরু মিথ্যে কথা বলেছেন?  তারা সব জানে, কিন্তু এতে তাদের কিছু যায় আসে না। তারা শিখেছে  গুরু যত ভুলই করুন, গুরু যত মিথ্যেই বলুন, যত প্রতারণাই করুন,   গুরুকে গুরু বলে মানতে হবে। গুরুকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে হবে। গুরু ১০০ খুন করে এলেও  গুরু নির্দোষ। বলাই বাহুল্য,  যুক্তিবুদ্ধিহীন অন্ধ বধির এক জনগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে  বাংলাদেশে। এই জনগোষ্ঠী তৈরির কারিগর মামুনুল হক এবং তার মৌলবাদী সহিংস  সতীর্থরা।

প্রথমে ভেবেছিলাম মামুনুল হক তাঁর প্রেমিকা নিয়ে প্রমোদ বিহারে গেছেন, যেতেই পারেন, প্রেম  করা   অন্যায় নয়। পরে কিছু ফোনালাপ থেকে বোঝা গেল   প্রেম নয়,  দুজন  মহিলার সঙ্গে তিনি প্রতারণা করছেন। নিজের স্ত্রীকে দিনের পর দিন  ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছেন, আর ওদিকে  জান্নাত আরা  ঝর্ণাকে, যাকে,  তিনি,   আল্লাহর কসম কেটে বলেছেন   বিয়ে করেছেন, আসলে যাকে তিনি  বিয়ে করেননি, নেহাত যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করছে্ন।  এত ভয়ংকর নারবিদ্বেষী লোক নারীর সঙ্গে প্রেম করেন  না, নারীকে নিজের বী*র্য ফেলার ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করেন। দুই রমণীই কিন্তু তাঁকে আপনি সম্বোধন করেন। দু'জনই তাঁকে প্রভু মানেন। প্রেম-ভালোবাসার  সম্পর্ক কখনও প্রভু-দাসির সম্পর্ক নয়। ঝর্ণার সঙ্গে কোনও এক ভাইয়ার ফোনালাপ থেকে আমরা জানতে পারি তিনি এবং মামুনুল হক  স্বামী স্ত্রীর মতো বাস করেন বটে, তবে   তাঁদের বিয়ের কোনও  কাবিননামা  হয়নি, রেজিস্ট্রেশানও হয়নি। ঝর্ণা নিজেই বলেছেন এ কথা।  কাবিননামা হয়নি, এবং রেজিস্ট্রেশান হয়নি মানে বিয়ে হয়নি। ঝর্ণা কিন্তু বিয়ে হবে বলে বসে আছেন, এবং মামুনুল হক তাঁকে ভোগ করে যাচ্ছেন বিয়ে করবেন এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে। এই কাজটি কারা করে বলে আমরা জানি? তাদের তো প্রতারণার দায়ে জেল খাটতে হয়।   সরকারি প্রশ্রয় পাচ্ছেন বলে মামুনুল হককে জেল খাটতে হচ্ছে না।   মামুনুল হক বাংলাদেশের আইনে বিশ্বাস না করলেও  শরিয়া আইনে বেশ বিশ্বাস করেন। তাঁকে যদি ব্যাভিচারের শাস্তি শরিয়া আইনে দেওয়া হয়  তাহলে   সেই শাস্তি তিনি   সহ্য করতে পারবেন তো? সেটি কিন্তু  পাথর ছুঁড়ে হত্যা। মামুনুল হকের ভাগ্য ভালো যে  তিনি যে  দেশে  বাস করেন, সে দেশে   শরিয়া আইন নেই, যে আইন  আনার জন্য তিনি  দিনভর  চিৎকার করেন, এবং ভক্তবৃন্দকে  উত্তেজিত করেন।

হেফাজতি নেতাদের মধ্যে মামুনুলের কীর্তি নিয়ে  ফোনালাপ, স্ত্রীকে মিথ্যে বলা শিখিয়ে দেওয়ার জন্য  মামুনুলের  ফোনালাপ, মামুনুলের স্ত্রীকে মামুনুলের দ্বিতীয় বিয়ে সম্পর্কে মিথ্যে বলার জন্য অনুরোধ করে    মামুনুলের বোনের ফোনালাপ, ঝর্ণার সঙ্গে মামুনুলের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত ঝর্ণার পুত্রের ফোনালাপ, ঝর্ণার সঙ্গে কাবিননামা এবং রেজিস্ট্রেশান না হওয়া বিষয়ে  এক ভাইয়ার ফোনালাপ, মামুনুলের সঙ্গে তৃতীয় মহিলার ঘনিষ্ঠ ফোনালাপ, মামুনুলের প্রতারণা    সম্পর্কে ঝর্ণার পুত্রের ভিডিও । এগুলো শুনলেই প্রতারক মামুনুলের চরিত্র উন্মোচিত হয়। মাত্র দুটি প্রতারণার কাহিনী  বেরোলো। এরকম কত কাহিনী আছে, কে জানে।

নারী নির্যাতন, নারী হেনস্থা, নারীর সঙ্গে প্রতারণা বাংলাদেশের বদ পুরুষলোকেরা অহরহই করে। মামুনুল যেহেতু নেতা, যেহেতু তার আদেশে লক্ষ পঙ্গপাল চারদিক পুড়িয়ে  ছাই করে দেয়, নিজেরা শুধু খুন করতে নেমে পড়ে না, নিজেরা খুন হতেও নেমে পড়ে, ---সেহেতু মামুনুলের চরিত্রের চুলচেরা বিশ্লেষণ জরুরি। পঙ্গপালগুলোর জানা জরুরি কোন নিকৃষ্ট লোকের, কোন প্রতারকের, মিথ্যুকের, কোন স্বার্থান্ধ বদ-লোকের আদেশ তারা মেনে চলে। হয়তো যারা অন্ধ ভক্ত, তাদের কোনও বোধোদয় হবে না। কিন্তু যারা এখনও অন্ধ হয়নি, তাদের তো পরিবর্তন হতে পারে।  

মানুষের সঙ্গে  প্রতারণা করা তো অপরাধ, মামুনুল তো সেই অপরাধ করছেনই,  সবচেয়ে বড় অপরাধ   তিনি করছেন,   তাঁর ওয়াজে   তিনি  প্রগতির বিরুদ্ধে, মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে, নারীর বিরুদ্ধে, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ বিষ উগরে দিচ্ছেন, সেই বিষের ক্রিয়ায় শত শত শিশু কিশোর যুবক      হিংস্র  দাঙ্গাবাজ হয়ে উঠছে। যুবসমাজকে তিনি  সন্ত্রাসবাদে আর জঙ্গিবাদে দীক্ষিত করছেন  -- এটি  নিশ্চিতই তাঁর   অক্ষমাযোগ্য অপরাধ। এইতো সেদিন তিনি মাদ্রাসার ছাত্রদের  লেলিয়ে দিয়েছেন সারাদেশ জুড়ে সন্ত্রাস করার জন্য। সন্ত্রাস করেছে তারা, দেশের অমূল্য সব সম্পদ পুড়িয়ে দিয়েছে, শুধু তাই নয়, নিজেরাও মরেছে। জেনেবুঝে দেশ ও মানুষের সর্বনাশ করা খুব বড়  অপরাধ। এই অপরাধের  কারণে মামুনুল হকের শাস্তি হওয়া অত্যন্ত জরুরি। তাঁর  কারণে মৃত্যু হলো ভক্তকুলের, কোথায় তিনি নিজেকে তাঁদের মৃত্যুর জন্য  দায়ী করে  গ্লানি বোধ করবেন, কোথায় তিনি কাঁদবেন, হাহাকার করবেন, তিনি চলে গেলেন আনন্দ করতে।  তারপরও কি ভক্তকুল তাঁর আচরণে ক্ষুব্ধ হবে না? গুরুর চরণামৃত খেয়ে গুণগান গাওয়া ছাড়া আর কিছু ভক্তকুলের  মগজে ঢোকানো হয়নি।

তবে মামুনুলকে নিয়ে  হেফাজতি অন্য নেতাদের মধ্যে কিছু অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাঁরা যদি কখনও মামুনুলকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হন, তাহলে কি এই সংগঠনকে কোনও সভ্য সংগঠন হিসেবে দাঁড় করানো সম্ভব হবে? আমার তো মনে হয় না।   মামুনুলের মতো প্রতারক যদি নাও হন ,  হেফাজতি নেতারা কিন্তু  সন্ত্রাসবাদে বিশ্বাস করেন, এ কথা সত্য। এ পর্যন্ত হেফাজতের নেতারা মাদ্রাসার শিশু কিশোরদের দিয়ে দেশ জুড়ে সন্ত্রাস ঘটানোর জন্য ক্ষমা চান নি, দুঃখ প্রকাশও করেননি। তবে কী কারণে মামুনুল হককেই  একা মন্দ বলে মনে করছি?  ভারতের  দেওবন্দিরা    কোনও দাঙ্গা ফ্যাসাদ ভায়োলেন্সে যায় না। কিন্তু দেওবন্দি আদর্শ মেনে চলা বাংলাদেশের  হেফাজতে ইসলাম, আফগানিস্তানের তালিবান, পাকিস্তানের লস্করে ঝাংভি, সিপাহে সাহাবা, তেহরিকে তালিবান দিব্যি    সন্ত্রাস করে বেড়াচ্ছে। পাকিস্তানে সিপাহে সাহাবা  সংগঠনটি নিষিদ্ধ হয়েছে। বাকি সব সন্ত্রাসী  সংগঠনই নিষিদ্ধ হওয়া উচিত।

রাজনৈতিক ইসলাম খুব বিপজ্জনক।   রাজনৈতিক ইসলামের নেতারা দেশে শরিয়া আইন চালু করতে চান, যে আইনে মেয়েদের কোনও  অধিকার  থাকবে না। যাঁরা    আল্লাহর কসম কেটে মিথ্যে কথা বলেন , তাঁরা, কোনও ভুল নয় যে,  আল্লাহর অস্তিত্বে  বিশ্বাস করেন  না। আল্লাহ রসুলকে তাঁরা নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ব্যবহার করেন মাত্র। শরিয়া আইন চালু করতে চান  তাঁদের নারীবিদ্বেষ আর অমুসলিমবিদ্বেষের জন্য। কোনও নারী যেন অধিকার বা স্বাধীনতা বলতে কিছু না পায়, কোনও অমুসলিমেরও যেন এ অঞ্চলে বাস করতে না পারে। 

যারা বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল নষ্ট করেছে, তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু যারা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের সঙ্গীত একাডেমী পুড়িয়ে দিয়েছে, যারা  লাইব্রেরি পুড়িয়েছে, যারা জনগণের সম্পদ বাস ট্রাক জ্বালিয়ে দিয়েছে, যারা মন্দির ভেঙ্গেছে  তাদের কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে না?  নাকি এই সন্ত্রাসবাদীদের সকল সন্ত্রাস ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে?  জানি সরকারি দলের অনেকে মনে করেন,   সত্যিকার রাজনৈতিক দল  থাকার চেয়ে প্রতিপক্ষ হিসেবে  ইসলামী মৌলবাদী সন্ত্রাসীরাই থাকা ভালো। এতে বিপদ দেখলে এদের দান দক্ষিণা দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, বাইরের বিশ্বের কাছ থেকে সহানুভূতিও  জুটবে, মৌলবাদের মোকাবেলা করার জন্য।

আধুনিকতাও চাই, মৌলবাদও চাই, এ হয় না। সংস্কৃতিও  চাই, অপসংস্কৃতিও চাই, এ হয় না। শান্তি চাই, সন্ত্রাসও চাই, এ হয় না।  দুই নৌকোয় পা দিয়ে চললে ডুবে মরতে হয়, এই সত্য কি ডুবে না মরা পর্যন্ত বিশ্বাস হবে না?

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র

প্রধান সম্পাদকঃ সৈয়দ আশিক রহমান
বেঙ্গল টেলিভিশন লিমিটেড

৪৩৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা-১২০৮

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২১ | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।