বিক্ষোভকারীরা ‘আল্লাহর শত্রু’, মৃত্যুদণ্ডের হুঁশিয়ারি ইরানের
চরম অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে নজিরবিহীন গণবিক্ষোভে উত্তাল ইরান। রাজধানী তেহরান থেকে শুরু হয়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রায় সব প্রান্তে। ক্রমেই সহিংস রূপ নেওয়া এই আন্দোলন দমনে এবার আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে ইরানের ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি সরকার। বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী ও তাদের সহায়তাকারীদের ‘মোহারেব’ বা ‘আল্লাহর শত্রু’ ঘোষণা করে মৃত্যুদণ্ডের হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে জানানো হয়, শনিবার (১০ জানুয়ারি) ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদের দপ্তর থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই ঘোষণা আসে। এতে বলা হয়, সংবিধানের ১৮৬ নম্বর ধারার আওতায় বিক্ষোভে সক্রিয় ব্যক্তিদের ‘মোহারেব’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং এ অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
ইরানের আইন অনুযায়ী, কোনো গোষ্ঠী বা সংগঠন যদি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অবস্থান নেয়, তবে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সদস্যদের পাশাপাশি তাদের লক্ষ্য সম্পর্কে জেনেও যারা সহায়তা করে, তারাও ‘মোহারেব’ হিসেবে গণ্য হতে পারেন— এমনকি তারা সরাসরি অস্ত্র হাতে না নিলেও। আইনের ১৯০ ধারায় এ অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড ছাড়াও ফাঁসি, অঙ্গচ্ছেদ কিংবা আজীবন নির্বাসনের মতো কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
অর্থনৈতিক বিপর্যয়ই এই আন্দোলনের মূল কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দীর্ঘদিনের অবমূল্যায়নে ইরানের মুদ্রা রিয়াল কার্যত ধসে পড়েছে। বর্তমানে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রায় ৯ লাখ ৯৪ হাজার রিয়াল পাওয়া যাচ্ছে, যা বিশ্বে অন্যতম দুর্বল মুদ্রায় পরিণত করেছে রিয়ালকে। এর ফলে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে এবং খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থানসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
এই পরিস্থিতিতে গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দেন। সেই ধর্মঘট থেকেই আন্দোলনের সূচনা হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে ইরানের ৩১টি প্রদেশের শহর ও গ্রামে। আন্দোলনকারীরা সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছেন, এমনকি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর দাবিও উঠেছে। কোথাও কোথাও জাতীয় পতাকা ছিঁড়ে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে।
সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করেছে। ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শনিবার থেকে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও ইসলামিক রিপাবলিক গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) মাঠে নামানো হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে শনিবার রাতে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে এই দমননীতিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর দমন-পীড়ন চালানো থেকে বিরত থাকতে ইরানকে সতর্ক করলেও তেহরান সরকার সে আহ্বান উপেক্ষা করেছে। বিবৃতিতে সরকার দাবি করেছে, যারা দেশকে অস্থিতিশীল করে বিদেশি প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬৫ জন নিহত হয়েছেন এবং দুই হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে ইরানের নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। তিনি আন্দোলনকারীদের পুরোনো সিংহ ও সূর্যচিহ্নিত জাতীয় পতাকা হাতে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে ১৯৭৯ সালে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে ইরান— এমনটাই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এসি//