আন্তর্জাতিক

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে যাচ্ছে সৌদি ও আমিরাত

যুদ্ধবিরতি নিয়ে একদিকে আলোচনা চলছে, অন্যদিকে নতুন করে উত্তেজনার খবর সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান দর-কষাকষিতে ওয়াশিংটন ১৫টি শর্ত দিয়েছে, আর তেহরান দিয়েছে ৫টি পাল্টা শর্ত।

এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র—সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্ত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের ধারাবাহিক হামলার কারণে দেশ দুটির অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়েছে। পাশাপাশি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের প্রভাব বাড়ার আশঙ্কাও তাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতার দিকে ঝুঁকছে।

তবে এখনো পর্যন্ত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সরাসরি যুদ্ধে নিজেদের সেনা মোতায়েন করেনি। কিন্তু তাদের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো ইরানের অর্থনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করা এবং মার্কিন বাহিনীর সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে উপসাগরীয় দেশগুলো জানিয়ে দিয়েছিল, তারা সরাসরি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে চায় না। কিন্তু অঞ্চলে তেহরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও হুমকির কারণে তাদের ওপর চাপ বাড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান যুদ্ধে আরব উপদ্বীপের পশ্চিম দিকে অবস্থিত সৌদি আরবের কিং ফাহদ বিমান ঘাঁটি মার্কিন বাহিনীকে ব্যবহারের অনুমতি দিতে সম্মত হয়। এর আগে রিয়াদ জানিয়েছিল, তারা ইরানের ওপর হামলার জন্য তাদের স্থাপনা বা আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না। কিন্তু রাজধানী রিয়াদ এবং সৌদি জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ইরানের ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে সেই অবস্থান এখন বদলে যাওয়ার সম্ভানা দেখা দিয়েছে।

গত সপ্তাহে উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরানের ধারাবাহিক হামলার পর সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান সাংবাদিকদের বলেন, ইরানি হামলার মুখে সৌদি আরবের ধৈর্য অসীম নয়। উপসাগরীয় দেশগুলো জবাব দিতে অক্ষম—এমন কোনো ধারণা করা ভুল হবে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুসারে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এখন পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আগ্রহী এবং যুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের খুব কাছাকাছি রয়েছেন।

সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের যুদ্ধে প্রবেশ করা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।

অন্যদিকে যুদ্ধ এক মাসের কাছাকাছি পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে ইরানি মালিকানাধীন সম্পদগুলোর ওপর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এই পদক্ষেপ তেহরানের শাসকদের জীবনরেখাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। আরব আমিরাত এখন যুদ্ধে তাদের সামরিক বাহিনী পাঠাবে কি না তা নিয়েও ভাবছে। এমনকি তেহরান সামরিক সক্ষমতাকে অক্ষত রাখে এমন যুদ্ধবিরতির বিরুদ্ধে লবিং করছে আরব আমিরাত।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর অনুযায়ী, আরব আমিরাত সম্প্রতি দুবাইতে অবস্থিত ইরানি হাসপাতাল এবং ইরানি ক্লাব বন্ধ করে দিয়েছে। সোমবার (২৩ মার্চ) হাসপাতালের ফোন নম্বর, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল এবং ওয়েবসাইট অকেজো করে দেওয়া হয়েছে।

সরকারি কর্মকর্তারা এক বিবৃতিতে বলেছেন, ইরানি শাসন ব্যবস্থা এবং ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হবে। কারণ, এগুলো নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে অপব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো ইরানি জনগণের উপকারে আসেনি কখনও এবং আমিরাতের আইনের পরিপন্থি।

আরব আমিরাতের দীর্ঘদিন ধরে ইরানি ব্যবসার আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এরমধ্যে তারা তেহরানকে সতর্ক করেছে, যুদ্ধের শুরুতে বড় ধরনের হামলার শিকার হওয়ার পর তারা এখন ইরানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করতে পারে। এই পদক্ষেপ ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার সীমিত করে দেবে, যা মুদ্রাস্ফীতি ও নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত দেশটির অর্থনীতিকে ধসের মুখে ফেলতে পারে।

সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতারের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে সাম্প্রতিক হামলা করায় উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো ইরানের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। কাতার এই হামলাগুলোকে বিপজ্জনক উস্কানি এবং তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররা ইরান যুদ্ধের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরান যদি অবিলম্বে হামলা বন্ধ না করে, তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই উপসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক বাহিনী সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। যুদ্ধ এক মাসে গড়ানোর আগেই এই অঞ্চলের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা এখন খাদের কিনারে।

 

এসি//

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন