ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবে ট্রাম্পের নীতিগত সম্মতি, কী আছে এই প্রস্তাবে
ইরান দাবি করেছে, তাদের প্রস্তাবিত ১০ দফা শান্তি পরিকল্পনা নীতিগতভাবে গ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল জানিয়েছে, এই প্রস্তাবই আগামী শুক্রবার (১০ এপ্রিল) শুরু হতে যাওয়া আলোচনার মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে আসন্ন সংলাপে এই ১০ দফা প্রস্তাবকে কেন্দ্র করেই আলোচনা এগোবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইরানের ১০ দফা ওই প্রস্তাবে রয়েছে—
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ
ইরান তাদের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত যাতায়াতের প্রস্তাব দিয়েছে। এটি কার্যকর হলে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথে ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ তৈরি হবে।
আগ্রাসন বন্ধ
ইরান চায়, যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে আর ইরানে হামলা চালাবে না। এই আগ্রাসন পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।
পরমাণু সমৃদ্ধকরণের অধিকার
ইরানের পরমাণু সমৃদ্ধকরণের অধিকার মেনে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে ইরান। যে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারছে না দেশ দুটি।
সৈন্য প্রত্যাহার
মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব যুদ্ধকালীন ঘাঁটি থেকে মার্কিন সৈন্য সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তেহরান।
মিত্রদের নিরাপত্তা
ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধেরও অবসান ঘটাতে হবে।
তবে বুধবার সকালে ইসরাইল জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে স্বাগত জানালেও লেবানন এই চুক্তির আওতাভুক্ত থাকবে না। তারা সকাল থেকে দেশটিতে কয়েক দফা হামলাও চালিয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
ইরানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সব নিষেধাজ্ঞা বাতিল করতে হবে।
সম্পদ ফেরত
বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের সব সম্পদ অবিলম্বে ফেরত দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি
ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বিভিন্ন সামরিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে তেহরানের পক্ষ থেকে।
আন্তর্জাতিক আইনি নিশ্চয়তা
ইসলামাবাদে সমঝোতা হওয়া প্রতিটি বিষয়কে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক রেজুলেশন হিসেবে পাস করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো পক্ষ এটি অস্বীকার করতে না পারে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আগামী শুক্রবার ইসলামাবাদে এসব বিষয়ে নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে এবং এই আলোচনার প্রক্রিয়া দুই সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
এদিকে ইরানের ওপর পূর্বঘোষিত বড় ধরনের হামলা অন্তত দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করতে রাজি হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে রাজি হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিও।
আলজাজিরার খবর জানায়, যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে রাজি হয়েছে তেহরান।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায়, পূর্বঘোষিত হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প জানান, ইরানে বড় ধরনের হামলার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন তিনি। আর এই সমঝোতায় মধ্যস্থতা করার জন্য পাকিস্তানকে কৃতিত্ব দেন তিনি। তবে শর্ত দেন, ইরানকে অবশ্যই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে হবে।
ট্রাম্প লিখেছেন, ‘পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের অনুরোধের ভিত্তিতে আমি ইরানের ওপর হামলা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত করতে সম্মত হয়েছি। তবে শর্ত হলো, ইরানকে অবিলম্বে এবং সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে হবে।’
ট্রাম্পের এই বার্তার কিছুক্ষণ পরই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি একটি সাময়িক চুক্তির কথা জানান।
তিনি বলেন, ‘যদি ইরানের ওপর হামলা বন্ধ থাকে, তবে তাদের সশস্ত্র বাহিনীও প্রতিরক্ষা কার্যক্রম স্থগিত রাখবে এবং দুই সপ্তাহের জন্য ইরানের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করা যাবে।’
আলজাজিরার সাংবাদিক ওসামা বিন জাভেদ তার এক বিশ্লেষণে বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সাম্প্রতিক ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি নিয়ে আসতে পারে।
তার মতে, দীর্ঘ সময় ধরে বড় সংঘাতের আশঙ্কায় পুরো অঞ্চলজুড়ে যে অস্থিরতা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তা এই ঘোষণার ফলে কিছুটা প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
তিনি আরও মন্তব্য করেন, পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তা ছিল আকাশচুম্বী পর্যায়ের।
তার ভাষায়, এই পরিস্থিতি শান্ত করার ক্ষমতা একমাত্র ট্রাম্পের মধ্যেই ছিল, কারণ এই উত্তেজনা বৃদ্ধির পেছনে তার ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি ছিল বলে তিনি মনে করেন।
এসি//