৩৮ বছর পর স্বামী ফিরলেও ভাঙেনি স্ত্রীর অভিমান
সময়ের ঘড়ি কখনো কখনো এমন গল্প লিখে রাখে, যেখানে ফিরে আসা মানুষটাও যেন নতুন করে অচেনা হয়ে যায়। তেমনই এক আবেগঘন ঘটনার সাক্ষী হয়েছে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বামন্দী বাজারের ক্যম্প পাড়া এলাকা। ৩৮ বছর আগে পারিবারিক মনোমালিন্যের কারণে বাড়ি ছেড়ে যাওয়া জবেদ আলি হঠাৎ করেই ফিরে এসেছেন নিজ গ্রামে। তবে এই দীর্ঘ সময়ে বদলে গেছে অনেক কিছু—মানুষ, সম্পর্ক আর জীবন।
জানা যায়, পারিবারিক কলহের জেরে জবেদ আলি একসময় বাড়ি ছেড়ে চলে যান। তখন বাড়িতে রেখে যান স্ত্রী রুশিয়া খাতুন এবং পাঁচ বছরের ছোট ছেলে জাহাঙ্গীর আলমকে। এরপর দীর্ঘ ৩৮ বছর তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। স্বজনেরা বহু খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান না পেয়ে একসময় ধরে নেন, তিনি হয়তো আর বেঁচে নেই। এরপর ধীরে ধীরে তার খোঁজ নেওয়াও বন্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু সময়ের দীর্ঘ ব্যবধান পেরিয়ে হঠাৎ করেই নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন জবেদ আলি। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই মানুষটিকে ফিরে পেয়ে স্বজনদের মধ্যে আনন্দের আবহ তৈরি হলেও সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে তার স্ত্রী রুশিয়া খাতুনের মধ্যে।
দীর্ঘ সময়ের অভিমান এখনো কাটেনি তার। স্বামীর ফিরে আসাকে সহজভাবে মেনে নিতে পারছেন না তিনি। অভিমানের কারণে জবেদ আলির জন্য বন্ধ করে দিয়েছেন ঘরের দরজাও।

পরিস্থিতিতে অসহায় হয়ে পড়া জবেদ আলি শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নেন তার ভাইয়ের ঘরে।
১৯৮৮ সালে অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে চলে যান জবেদ আলি। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকের কাজ করে জীবন কাটিয়েছেন বলে জানান তিনি।
রুশিয়া খাতুনের অভিযোগ, জবেদ আলির আরেকটি সংসার ছিল। দ্বিতীয় বিয়ে করার পর তিনি স্ত্রী ও সন্তানকে কার্যত অসহায় অবস্থায় ফেলে যান। এ কারণে তিনি একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানে আর্থিক সংকট দেখা দিলে শুরু হয় কঠিন সংগ্রাম।
আরেকটি সংসারের কথা অবশ্য স্বীকার করেছেন জবেদ আলি ।
রুশিয়া খাতুন বলেন, ‘ওই সময় তাকে সব জায়গায় খুঁজেও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। বুকের সন্তানকে নিয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছি। মানুষের বাড়িতে এমন কোনো কাজ নেই, যা করিনি। সন্তানকে বড় করতে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করেছি।’
তিনি জানান, পরে ছেলে বড় হয়ে কৃষিশ্রমিকের কাজ শুরু করে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নেয়। বর্তমানে জাহাঙ্গীর কুয়েতপ্রবাসী। তার আয়ে সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে।
স্বামীকে মেনে নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে রুশিয়া খাতুন বলেন, ‘তার ফিরে আসা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। ৩৮ বছর সন্তান নিয়ে অথৈ সাগরে ভেসেছি। তখন কি একবারও তার মনে হয়েছে, ঘরে থাকা নিষ্পাপ শিশুটি কী খাচ্ছে, কীভাবে বেঁচে আছে? যে সময়ে একজন স্ত্রীর জন্য স্বামীই ছিল বেঁচে থাকার অবলম্বন, সেই সময় তাকে পাশে পাইনি।
এখন সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরেছে, তাই কেন সে এসেছে? ছেলে বিদেশ থেকে ফিরে এলে তার মতামত অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’

জবেদ আলির ভাই ও ভাতিজারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকার কারণে প্রায় তিন বছর আগে তারা ধরে নিয়েছিলেন, জবেদ আলি আর বেঁচে নেই। পরে তার খোঁজাখুঁজি বন্ধ করে দেন। তবে তারা আশা করছেন, পারিবারিক আলোচনার মাধ্যমে জবেদ আলির স্ত্রী ও ছেলে তাকে মেনে নেবেন।
তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের দূরত্ব ও অভিমান একসময় কেটে যাবে এবং পরিবারটি আবার একসঙ্গে বসবাস করতে পারবে।
জবেদ আলি জানান, মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার কুন্ডুরিয়া গ্রামে তিনি আরেকটি সংসার গড়েছিলেন। সেখানে তার একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। তবে ওই স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘পরিবার ও স্বজনরা যদি আমাকে মেনে নেয়, তাহলে মেয়েকেও এখানে নিয়ে আসব।’
বাড়ি ছাড়া কারণ সাংসারিক ও ব্যক্তিগত বিষয় উল্লেখ করে এড়িয়ে যান জবেদ আলি।
কী কারণে তিনি বাড়ি ছেড়েছিলেন, জানতে চাইলে জবেদ আলি তা সাংসারিক ও ব্যক্তিগত বিষয় উল্লেখ করে এড়িয়ে যান।
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর এমন ফিরে আসা এলাকায় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে আনন্দের মাঝেও পরিবারে রয়ে গেছে এক নীরব অভিমান আর অসমাপ্ত অপেক্ষার গল্প।
এসি//