খেলাধুলা

চোখের জলে অনাগত সন্তানকে গোল উৎসর্গ করলেন কোডি গাকপো

ছবি: দ্য সান

ফুটবল মাঠে গোল মানেই সাধারণত উচ্ছ্বাস, চিৎকার, সতীর্থদের আলিঙ্গন আর হাজারো সমর্থকের উন্মাদনা। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে এবার একটি গোলের পর দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য। বল জালে জড়ানোর পর নেদারল্যান্ডসের ফরোয়ার্ড কোডি গাকপো ছুটলেন না, হাত মুঠো করে উদ্‌যাপন করলেন না। বরং মাঠেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন তিনি। মাথা নিচু, চোখে জল, জার্সিতে মুখ ঢেকে ফেললেন লিভারপুল তারকা।

সেই মুহূর্তে স্কোরবোর্ডে শুধু একটি গোল লেখা হয়নি, লেখা হয়েছিল একজন মানুষের ভেতরের লড়াইয়ের গল্প।

মরক্কোর বিপক্ষে বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর ম্যাচে ৭২ মিনিটে ডাচদের এগিয়ে দেন গাকপো। ক্রিসেনসিও সামারভিলের কাছ থেকে বল পেয়ে নিচু শটে মরক্কোর গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনোকে পরাস্ত করেন তিনি। কিন্তু গোলের পর যে আবেগ প্রকাশ পেল, তা ছিল আনন্দের চেয়েও অনেক গভীর।

কারণ কয়েক দিন আগেই গাকপো ও তার সঙ্গী নোয়া ভ্যান ডার বাই হারিয়েছেন তাদের অনাগত সন্তানকে। সেই ব্যক্তিগত শোক নিয়েই দেশের হয়ে বিশ্বকাপের লড়াইয়ে নামেন এই ডাচ ফরোয়ার্ড।

গোলের পর সতীর্থরা বুঝতে পেরেছিলেন মুহূর্তটির গুরুত্ব। একে একে সবাই ছুটে এসে গাকপোকে ঘিরে ধরেন। কেউ জড়িয়ে ধরেন, কেউ সান্ত্বনা দেন। মিকি ফন ডে ফেন তার মাথায় চুমু দেন, অধিনায়ক ভার্জিল ফন ডাইকও পাশে দাঁড়ান। কান্নাভেজা চোখে গাকপো আকাশের দিকে তাকিয়ে যেন তার হারানো সন্তানকে স্মরণ করেন। এরপর মাঠে ফিরে যাওয়ার সময় অনাগত সন্তানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আকাশের দিকে ইশারা করেন তিনি।

এরপর সামারভিলের সঙ্গে গোল উদ্‌যাপনে যোগ দেন তিনি। মুখে ফুটে ওঠে ছোট্ট এক হাসি—যেন কষ্টের মাঝেও কয়েক সেকেন্ডের জন্য ফিরে আসে স্বাভাবিকতা।

গাকপোর সঙ্গী নোয়া ভ্যান ডার বাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছিলেন তাদের বেদনাদায়ক খবর। তিনি লিখেছিলেন, গর্ভাবস্থার সময় তারা তাদের সন্তানকে হারিয়েছেন। ভালোবাসা ও সমর্থনের জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি সন্তানের নামও প্রকাশ করেন।

তাদের অনাগত সন্তানের নাম রাখা হয়েছিল—এলিজাহ রাফায়েল গাকপো। ভ্যান ডার বাই লিখেছিলেন, “চিরকাল ভালোবাসার, চিরকাল আমাদের সন্তান।”

এলিজাহ ছিল তাদের দ্বিতীয় সন্তান। এর আগে ২০২৪ সালে তারা প্রথম সন্তান স্যামুয়েল সেট গাকপোকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। ভ্যান ডার বাই জানিয়েছিলেন, সন্তানের স্মরণে তারা একটি গির্জায় মোমবাতি জ্বালিয়েছিলেন। সেখানে একই নামের আরেক শিশুর সঙ্গে দেখা হওয়াকে তিনি দেখেছিলেন বিশেষ এক ইঙ্গিত হিসেবে।

এমন কঠিন সময়ে গাকপোকে পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিল নেদারল্যান্ডস দল। কিন্তু তিনি দলের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। কোচ রোনাল্ড কোমানও তার মানসিক দৃঢ়তার প্রশংসা করেছিলেন। কোমান জানান, খবরটি ছিল অত্যন্ত কষ্টের, তবে গাকপো বিষয়টি পরিণতভাবে সামলেছেন এবং দল তার পাশে ছিল।

গাকপোর গোল তখন মনে হচ্ছিল, হয়তো শোকের গল্পটি জয়ের গল্পে বদলে যাবে। কিন্তু ফুটবল যে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তায় ভরা, তার প্রমাণ মিলল আবারও।

ম্যাচের শেষ সময়ে ইসা দিওপের হেডে সমতায় ফেরে মরক্কো। নির্ধারিত সময় শেষে ১-১ সমতায় থাকা ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানেও কোনো দল গোল করতে না পারায় ভাগ্য নির্ধারণ হয় টাইব্রেকারে।

টাইব্রেকারে ইয়াসিন বোনোর দুর্দান্ত নৈপুণ্যে ৩-২ ব্যবধানে জয় পায় মরক্কো। নাটকীয় সেই লড়াইয়ে বিদায় নেয় নেদারল্যান্ডস, আর গাকপোর আবেগঘন গোল শেষ পর্যন্ত জয়ের স্মৃতি হয়ে থাকতে পারেনি।

তবু বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই মুহূর্তটি থেকে যাবে অন্য কারণে। কারণ কখনো কখনো ফুটবলের সবচেয়ে বড় গল্প লেখা হয় গোলের সংখ্যায় নয়—একজন খেলোয়াড়ের চোখের জল, হারানোর কষ্ট আর আবারও দাঁড়িয়ে যাওয়ার সাহসে।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন