কেন কিছু মানুষকে মশা বেশি কামড়ায়?
একই জায়গায় বসে থাকলেও দেখা যায়, একজনকে মশা বারবার কামড়াচ্ছে, আর পাশের মানুষটি প্রায় অক্ষত। অনেকের ধারণা, যাদের রক্ত “মিষ্টি”, মশা নাকি তাদেরই বেশি পছন্দ করে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর সঙ্গে রক্তের মিষ্টতার কোনো সম্পর্ক নেই। মূল কারণ হলো শরীর থেকে নির্গত কিছু জৈবিক সংকেত।
শুধু স্ত্রী মশাই মানুষকে কামড়ায়। ডিম উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন সংগ্রহ করতে তারা রক্ত পান করে। মানুষকে খুঁজে বের করার জন্য মশা বিভিন্ন ধরনের জৈবিক সংকেত ব্যবহার করে।
কার্বন ডাই-অক্সাইডের ভূমিকা
মশা প্রায় ১০ মিটার দূর থেকেই মানুষের নিঃশ্বাসে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড শনাক্ত করতে পারে। যারা তুলনামূলক বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করেন, তারা মশার কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেন।
এ কারণে সাধারণত প্রাপ্তবয়স্করা শিশুদের তুলনায় বেশি কামড়ের শিকার হন। একইভাবে ব্যায়ামের সময় বা পরে শরীর থেকে বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড বের হওয়ায় তখন মশার আক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ে। বড় গড়নের মানুষের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য।

শরীরের তাপ ও ঘাম
মশা শুধু গন্ধ নয়, শরীরের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতাও অনুভব করতে পারে। গর্ভবতী নারীরা সাধারণ নারীদের তুলনায় বেশি মশার কামড়ের শিকার হতে পারে। কারণ গর্ভাবস্থায় শরীরের তাপমাত্রা, বিপাকক্রিয়া এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের হার বেড়ে যায়।
ব্যায়ামের পর শরীর গরম হয়ে গেলে এবং ঘাম জমলে মশার আকর্ষণ আরও বৃদ্ধি পায়।

শরীরের গন্ধই সবচেয়ে বড় কারণ
গবেষকদের মতে, মানুষের শরীরের গন্ধই মশাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে। ত্বকে থাকা অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া ঘাম ও অন্যান্য উপাদান ভেঙে বিভিন্ন ধরনের ভোলাটাইল অর্গানিক কম্পাউন্ড (কার্বন-ভিত্তিক রাসায়নিক, যা সাধারণ তাপমাত্রায় সহজেই বাষ্পীভূত হয়ে বাতাসে মিশে যায়) তৈরি করে। এসব রাসায়নিক বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং মশা সহজেই তা শনাক্ত করতে পারে।

বিশেষ করে অ্যামোনিয়া, ল্যাকটিক অ্যাসিড এবং কার্বক্সিলিক অ্যাসিডের মতো যৌগ মশাকে বেশি আকর্ষণ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ত্বকে কার্বক্সিলিক অ্যাসিডের মাত্রা বেশি, তারা অন্যদের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি মশার আকর্ষণের কেন্দ্র হতে পারেন।
জিনগত প্রভাবও রয়েছে
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মশার কাছে কারও আকর্ষণীয় হওয়ার পেছনে বংশগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, অভিন্ন যমজদের ক্ষেত্রে মশার আকর্ষণের মাত্রা প্রায় একই রকম হলেও অনভিন্ন যমজদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকে। অর্থাৎ শরীরের গন্ধ তৈরিতে জিনেরও ভূমিকা রয়েছে।
কেন কারও বেশি চুলকায়?
সব মানুষের শরীর মশার কামড়ে একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না। কারও শরীরে বড় ও চুলকানিযুক্ত ফোলা দাগ হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে ছোট লাল দাগ দেখা যায়। তাই অনেক সময় মনে হতে পারে কাউকে বেশি মশা কামড়াচ্ছে, অথচ বাস্তবে তার শরীরের প্রতিক্রিয়াই বেশি দৃশ্যমান।
মশার কামড় কমাতে কী করবেন?
- মশা প্রতিরোধক (রিপেলেন্ট) ব্যবহার করুন।
- লম্বা হাতা জামা ও লম্বা প্যান্ট পরুন।
- সন্ধ্যা ও ভোরে বাইরে থাকলে অতিরিক্ত সতর্ক থাকুন।
- ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করুন।
- আশপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার রাখুন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেউ মশার কাছে বেশি আকর্ষণীয় হতে পারেন, তবে কেউই পুরোপুরি নিরাপদ নন। তাই ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া ও জিকা ভাইরাসের মতো মশাবাহিত রোগ থেকে সুরক্ষায় সবারই প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চলা জরুরি।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
এমএ//