আন্তর্জাতিক

ভারতজুড়ে ‘জুলাইয়ের হাওয়া’, বেজে গেছে কি মোদির বিদায়ঘন্টা?

ছবি: সংগৃহীত

ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার, ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হচ্ছে। রাজধানী দিল্লিতে হাজারো তরুণ-তরুণীর অবস্থান কর্মসূচির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থী, কৃষক ও সাধারণ মানুষ আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে দিল্লির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। এদিকে আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে পুলিশের করা একাধিক মামলার পরও কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যঙ্গাত্মক একটি অনলাইন উদ্যোগ হিসেবে কয়েক মাস আগে রাজনৈতিক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রাম ও এক্সে (সাবেক টুইটার) ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করেন। পরে সদস্য নিবন্ধনের ফরম প্রকাশ করা হলে অল্প সময়ের মধ্যেই হাজারো মানুষ এতে যুক্ত হন। এরপরই উদ্যোগটি বড় আকারের তরুণ আন্দোলনে রূপ নেয়।

গত ১৯ জুলাই সংগঠনটি ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচির ডাক দেয়। ওই কর্মসূচিতে দিল্লিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। একই সময়ে মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও গোয়াসহ বিভিন্ন শহরেও বিক্ষোভ, মিছিল এবং মোমবাতি প্রজ্বালন কর্মসূচি পালন করা হয়।

সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের অনশন আন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয়। গত ২৮ জুন তিনি দিল্লির যন্তর মন্তরে অনশন শুরু করেন। পরে পুলিশ তাকে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ আরও বাড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে হাসপাতালেও তিনি অনশন অব্যাহত রেখেছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামটির পেছনেও রয়েছে একটি প্রতীকী প্রতিবাদ। ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে ব্যঙ্গ করেই এই নাম বেছে নেওয়া হয়েছে। এক শুনানিতে তিনি ভুয়া সনদধারী কয়েকজনকে ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। পরে তিনি স্পষ্ট করেন, মন্তব্যটি দেশের সব তরুণকে উদ্দেশ্য করে করা হয়নি। এরপরই আন্দোলনকারীরা সেই নাম গ্রহণ করে নিজেদের প্রতিবাদ সংগঠিত করেন।

আন্দোলনের মূল দাবির মধ্যে রয়েছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।

চলতি বছরের চিকিৎসা শিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষায় প্রায় ২২ লাখ ৮০ হাজার পরীক্ষার্থী অংশ নেন। পরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এ ঘটনায় সৃষ্ট মানসিক চাপের কারণে অন্তত ২০ জন পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।

এদিকে সোমবারের ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী ও পুলিশের সংঘর্ষ, ভাঙচুর এবং সহিংসতার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ছয়টি মামলা করেছে দিল্লি পুলিশ। তবে এসব পদক্ষেপ আন্দোলন থামাতে পারবে না বলে জানিয়েছে সিজেপি।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে শত শত কৃষক গরু-মহিষ নিয়ে দিল্লির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছেন। একই সঙ্গে পাঞ্জাবের শত শত শিখসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও হাজারো মানুষ রাজধানীমুখী হচ্ছেন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তাদের দিল্লিতে পৌঁছানো ঠেকাতে প্রশাসন বিভিন্ন ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে।

বুধবার (২২ জুলাই) আন্দোলনের মুখপাত্র সৌরভ দাস জানান, সরকার চাইলে তারা আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তবে সেই বৈঠক কোনো সরকারি দপ্তর বা মন্ত্রীর বাসভবনে নয়; যন্তর মন্তর কিংবা নিরপেক্ষ কোনো স্থানে হতে হবে।

তিনি বলেন, শুরু থেকেই তারা সংলাপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

এদিকে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে ভারতের কয়েকটি বিরোধী রাজনৈতিক দল। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জকে গণতন্ত্রের ওপর আঘাত বলে উল্লেখ করেছেন। বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীও সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন জোটের সংসদীয় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে আসার পর সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় পুনরায় পরীক্ষা আয়োজন এবং দ্রুত ফল প্রকাশ করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

মোদি আরও বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দেশের সর্বোচ্চ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং দোষীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

এদিকে বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ভারতের এই তরুণ আন্দোলন বাংলাদেশ ও নেপালের সাম্প্রতিক জেন-জি আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করছে।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন