২৯ বছর আগে যে আন্দোলন গড়েছিল ধর্মেন্দ্রকে, সেই আন্দোলনেই শেষ হলো মন্ত্রিত্ব
প্রায় তিন দশক আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছিলেন এক তরুণ ছাত্রনেতা। পুলিশের লাঠিচার্জে গুরুতর আহত হলেও আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াননি তিনি। সেই তরুণই পরে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হন। আর তিন দশক পর, একই ধরনের প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে হলো তাকে। ঘটনাটি ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ঘিরে।
১৯৯৭ সালে ওডিশায় উচ্চমাধ্যমিক (প্লাস টু) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে তীব্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন কংগ্রেস নেতা ভগবত প্রসাদ মহান্তি। ভুবনেশ্বরের রাজ্য সচিবালয়ের সামনে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী আন্দোলনে অংশ নেন। সেই আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) জাতীয় সম্পাদক ধর্মেন্দ্র প্রধান।
শনিবার (২৫ জুলাই) এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনটি প্রথমে শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এতে ধর্মেন্দ্র প্রধান গুরুতর আহত হন এবং তার শরীরের কয়েকটি হাড় ভেঙে যায়। তবে এতেও আন্দোলন থেকে পিছু হটেননি তিনি।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের জুনিয়র এবং বর্তমানে আরএমডি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ প্রশান্ত রাউত এনডিটিভিকে বলেন, প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী ওই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। ধর্মেন্দ্র প্রধানই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। পুলিশি হামলায় তিনি গুরুতর আহত হলেও তার মনোবল ভাঙেনি।
বিক্ষোভের পর তৎকালীন ওডিশা সরকার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসে। তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সচিবসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের অপসারণ করা হয়। একই সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পরবর্তী পরীক্ষাগুলো প্রশ্নপত্র ফাঁস ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সেই আন্দোলনের প্রায় ২৯ বছর পর ইতিহাস যেন উল্টো পথে হাঁটল। এবার কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিট-ইউজি ২০২৬ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষা-সংক্রান্ত নানা অনিয়মের অভিযোগে নিজেই তীব্র আন্দোলনের মুখে পড়েন ধর্মেন্দ্র প্রধান।
গত ২০ জুন দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভের পর শনিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।
এক্সে প্রকাশ করা পদত্যাগপত্রে তিনি জানান, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার দায় তিনি শুরু থেকেই নিজের কাঁধে নিয়েছেন। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের তরুণদের বিভ্রান্তির মধ্যে রাখতে চান না বলেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, দেশের তরুণদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশার প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ায় তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের আগে সরকার পুরো ঘটনার তদন্তভার সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেয়। বাতিল করা হয় নিট পরীক্ষা। পরে পুনঃপরীক্ষা আয়োজন করা হয়। ভবিষ্যতে নিট পরীক্ষা পুরোপুরি কম্পিউটারভিত্তিক (সিবিটি) পদ্ধতিতে নেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়েছে। এছাড়া প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে আরও কঠোর শাস্তির বিধান রেখে নতুন আইনের খসড়াও অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
এদিকে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে আন্দোলনের প্রথম বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে ককরোচ জনতা পার্টি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, এটি ৩৬ দিনের আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলেও আন্দোলন এখানেই শেষ নয়।
তার মতে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের প্রতিটি পরিবারকে ১ কোটি রুপি ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না এবং বিক্ষোভে পুলিশের নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত সদস্যদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রায় তিন দশক আগে যে ধর্মেন্দ্র প্রধান প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর জবাবদিহি দাবি করেছিলেন, সময়ের ব্যবধানে আজ একই ইস্যুতে নিজের পদত্যাগের মাধ্যমে যেন সেই ইতিহাসই নতুনভাবে ফিরে এলো।
এসি//