কোঁকড়ানো চুলের রহস্য লুকিয়ে কেশমূল ও জিনে
সকালের আলোয় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল দেখে কখনও কি মনে হয়েছে, ইশ! যদি একটু সোজা হতো? আবার যাদের চুল একেবারে সোজা, তাদের অনেকেই স্বপ্ন দেখেন ঢেউ খেলানো বা কুণ্ডলী পাকানো চুলের। তাই পার্লারের চেয়ার থেকে শুরু করে ঘরোয়া নানা কৌশল—চুলের স্বাভাবিক রূপ বদলাতে চেষ্টার শেষ নেই। কিন্তু প্রকৃতি যে নকশা একবার এঁকে দেয়, তাকে স্থায়ীভাবে বদলে দেওয়া সহজ নয়। কারণ চুল সোজা হবে নাকি কোঁকড়ানো, সেই সিদ্ধান্ত অনেক আগেই নিয়ে রেখেছে আমাদের শরীর—জন্মেরও আগে।
গবেষকদের মতে, চুলের ধরন নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে কেশমূল বা হেয়ার ফলিকল। ত্বকের নিচে থাকা এই ক্ষুদ্র গঠন থেকেই চুলের জন্ম। ফলিকলের আকৃতি যেমন হবে, বাইরে বের হওয়া চুলও তেমনই হবে।
সব রহস্য কেশমূলে
গবেষণায় দেখা গেছে, যদি হেয়ার ফলিকল লম্বালম্বি ও সোজা হয়, তাহলে সেখান থেকে গজানো চুলও সোজা হয়। আর ফলিকল যদি বাঁকানো থাকে, তাহলে চুলও ঢেউ খেলানো কিংবা কুণ্ডলী পাকানো হয়ে ওঠে। অর্থাৎ ফলিকল এক ধরনের প্রাকৃতিক ছাঁচের মতো কাজ করে, যা চুলের আকৃতি নির্ধারণ করে দেয়।
কেরাটিনের অসম বণ্টনও বড় কারণ
চুলের গঠন নির্ভর করে কেবল ফলিকলের আকৃতির ওপর নয়, এর ভেতরের কোষগুলোর কার্যক্রমের ওপরও।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, ফলিকলের এক পাশের কোষ যদি অন্য পাশের তুলনায় দ্রুত বিভাজিত হয়ে পরিপক্ব হয়, তাহলে চুলের দুই পাশে কেরাটিনসহ অন্যান্য উপাদানের বণ্টনে পার্থক্য তৈরি হয়। এই অসম গঠনই চুলকে বাঁকিয়ে দেয় এবং তৈরি করে কোঁকড়ানো বা ঢেউ খেলানো আকৃতি। অন্যদিকে, ফলিকলের দুই পাশের কোষ সমানভাবে বৃদ্ধি পেলে এবং কেরাটিনের বণ্টনও সমান থাকলে চুল সোজা হয়।
ডাইসালফাইড বন্ডের প্রভাব
চুল মূলত কেরাটিন নামের প্রোটিন দিয়ে তৈরি। এই প্রোটিনের অণুগুলোর মধ্যে থাকে ডাইসালফাইড বন্ড নামে বিশেষ রাসায়নিক বন্ধন। সোজা চুলে এই বন্ধনগুলো সমান্তরালভাবে সাজানো থাকে। কিন্তু কোঁকড়ানো চুলে একই বন্ধন আঁকাবাঁকা বিন্যাস তৈরি করে। ফলে চুলও স্বাভাবিকভাবে কুণ্ডলী পাকানো আকৃতি ধারণ করে।
সবশেষে কথা বলে জিন
চুলের ধরন নির্ধারণে বংশগত বৈশিষ্ট্যের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় টিসিএইচএইচ (TCHH), ইডিএআর (EDAR) এবং কেআরটি৭১ (KRT71)—এই তিনটি জিনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উঠে এসেছে।
এর মধ্যে টিসিএইচএইচ জিনকে কোঁকড়ানো চুলের অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই জিনের প্রভাবে কেশমূলে কেরাটিনের বণ্টন সমান থাকে না, ফলে চুল কুণ্ডলী পাকিয়ে গজায়। জিনটি বাবা-মায়ের কাছ থেকেই সন্তানের মধ্যে আসে।
অন্যদিকে, এশীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইডিএআর জিন তুলনামূলক বেশি সক্রিয়। আর কেআরটি৭১ জিন কেরাটিন তৈরির নির্দেশনা দেয়। এই জিন সক্রিয় থাকলে শুধু চুল কোঁকড়ানোই নয়, চুলের ঘনত্বও তুলনামূলক বেশি হতে পারে। এটিও বংশগতভাবে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায়।
প্রকৃতির নিজস্ব নকশা
তাই কোঁকড়ানো চুল আঁচড়াতে গিয়ে বিরক্ত হওয়া কিংবা সোজা চুলকে জোর করে কুণ্ডলী পাকানোর চেষ্টা—কোনোটিই স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ চুলের প্রকৃত রূপ নির্ধারণ করে কেশমূলের গঠন, কেরাটিনের বিন্যাস, রাসায়নিক বন্ধন এবং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জিন। অর্থাৎ মাথার চুলের এই বৈচিত্র্যের নেপথ্যে কাজ করে প্রকৃতির সূক্ষ্ম বিজ্ঞান, যা জন্মের আগেই আমাদের জন্য নির্ধারিত হয়ে যায়।
এসি//