আন্তর্জাতিক

সিএনএনের বিশ্লেষণ

একটি সিদ্ধান্তই হতে পারে ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল!

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সামরিক অভিযানের কারণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে এখন কঠিন রাজনৈতিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে তার প্রেসিডেন্সির সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত তিনি একটি বড় ঝুঁকি এড়িয়েছেন—সংঘাতকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাননি, যা পরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

মঙ্গলবার (০৪ আগস্ট) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অতীত যুদ্ধের ইতিহাসে দেখা যায়, ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তানে একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার পরিবর্তে তা আরও বিস্তৃত করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তই তাদের দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর সংঘাতে জড়িয়ে ফেলে।

বর্তমানে ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। প্রথমটি হলো, সীমিত বিমান হামলা, নৌ অবরোধ এবং ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির বর্তমান কৌশল অব্যাহত রাখা। দ্বিতীয়টি, সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত করে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো, এমনকি প্রয়োজনে সীমিত স্থল অভিযান শুরু করা। তৃতীয় বিকল্প হলো, ঘোষিত সামরিক লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন না করেই ধীরে ধীরে সংঘাত থেকে সরে আসা।

বিশ্লেষকদের মতে, এই তিনটি বিকল্পের কোনোটিই ট্রাম্পের জন্য সহজ নয়। কারণ যে পথই তিনি বেছে নিন, তার সঙ্গে রাজনৈতিক ঝুঁকি জড়িয়ে রয়েছে।

এর আগে সোমবার ইরান আবারও জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো সরাসরি আলোচনা চলছে না। এর পরই ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে ইরানের নেতৃত্বকে ‘দ্বিমুখী’ বলে আখ্যা দেন।

পরে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, একটি গ্রহণযোগ্য চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য এটি ইরানের ‘শেষ সুযোগ’। অন্যথায় দেশটির নেতৃত্বকে ‘শিরশ্ছেদ’-এর মুখোমুখি হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

তবে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, ইরান যদি এই হুঁশিয়ারিও উপেক্ষা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে?

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে বড় ধরনের হামলা চালায়, তাহলে তেহরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা আঘাত হানতে পারে। এতে শুধু যুদ্ধই বিস্তৃত হবে না, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতিও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।

সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের নেতারাও ট্রাম্পকে এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে হরমুজ প্রণালিতে নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়িয়ে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে পড়বে।

অন্যদিকে ইরানের খার্গ দ্বীপসহ কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে স্থল অভিযান শুরু হলে তা আরও বড় আকারের যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। এতে প্রাণহানি, সামরিক ব্যয় এবং রাজনৈতিক চাপ—সবই বাড়বে।

সিএনএনের বিশ্লেষণে অতীতের উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে, ১৯৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন ভিয়েতনাম যুদ্ধ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেন। পরে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনও সেই যুদ্ধ চালিয়ে যান, যদিও তখন অনেকের মতে যুক্তরাষ্ট্রের বিজয়ের সম্ভাবনা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল।

একইভাবে ২০০৭ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাকে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেন। পরে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও আফগানিস্তানে সেনা বৃদ্ধি করলেও শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হয়।

২০১৬ সালের নির্বাচনি প্রচারে ট্রাম্প নিজেই দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি যুদ্ধের সমালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অন্তহীন যুদ্ধ’ থেকে বের করে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

কিন্তু এখন তিনি এমন একটি সংঘাতের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যার পরিণতি এখনো অনিশ্চিত। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ কীভাবে শেষ হয়, সেটিই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে ট্রাম্পের রাজনৈতিক এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কেমন হবে।

 

এমএ//

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন