আজ পবিত্র আখেরি চাহার সোম্বা
আজ বুধবার, পবিত্র আখেরি চাহার সোম্বা। হিজরি বর্ষপঞ্জির সফর মাসের শেষ বুধবার মুসলিম সমাজে এ নামে পরিচিত। ‘আখেরি চাহার সোম্বা’ শব্দগুচ্ছের অর্থ ‘শেষ বুধবার’। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের শেষ অসুস্থতার সময় সাময়িক সুস্থতা অনুভব করার স্মৃতিকে কেন্দ্র করে দিনটি বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মর্যাদা ও ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
ইসলামি ইতিহাস ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, একাদশ হিজরির সফর মাসের শেষের দিকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ায় তাঁর দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্ম ও মসজিদে গিয়ে নামাজে ইমামতি করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। প্রিয় নবীর এই কঠিন অসুস্থতায় পুরো মদিনাজুড়ে সাহাবিদের মাঝে গভীর উদ্বেগ ও বিষাদের ছায়া নেমে আসে। ভক্ত ও অনুসারীরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দ্রুত সুস্থতার জন্য ব্যাকুল হয়ে মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করতে থাকেন। সফর মাসের শেষ বুধবারে অলৌকিকভাবে মহানবী (সা.) তাঁর দীর্ঘ ও কষ্টদায়ক অসুস্থতা থেকে কিছুটা স্বস্তি ও সুস্থতা অনুভব করেন। তাঁর শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে এলে তিনি গোসল করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সাহাবিরা পরম যত্নে সাতটি মশক থেকে পানি এনে প্রিয় নবীকে গোসল করার ব্যবস্থা করে দেন। গোসলের পর শারীরিক ক্লান্তি কাটে এবং তিনি বেশ চাঙ্গা বোধ করেন।
দীর্ঘ বিষাদের পর আল্লাহর নবীকে নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে হালকা হাঁটাচলা করতে এবং সুস্থ হতে দেখে পুরো মদিনার সাহাবিদের মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। সুস্থ বোধ করার পর মহানবী (সা.) হযরত আলী (রা.) এবং হযরত আব্বাস (রা.)-এর ওপর ভর দিয়ে ধীরপায়ে মসজিদে নববীতে তাশরিফ আনেন। প্রিয় নবীকে স্বশরীরে মসজিদে প্রবেশ করতে দেখে উপস্থিত সাহাবিরা আনন্দে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। সেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) উপস্থিত ভক্ত ও সাহাবিদের সঙ্গে নিয়ে জোহরের নামাজ আদায় করেন এবং পরবর্তীতে সাহাবিদের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত নসিহত প্রদান করেন। ওই দিনই শেষবারের মতো গোসল করে নামাজে ইমামতি করেন রাসুল (সা.)।
বিচ্ছেদ ও বিষাদের শঙ্কার পর প্রিয় নবীকে নিজেদের মাঝে ফিরে পেয়ে সাহাবিরা আল্লাহর দরবারে অশেষ শুকরিয়া জ্ঞাপন করেন। এই মহাআনন্দের ও স্বস্তির দিনে সাহাবিরা তাঁদের পরম প্রিয় রাসুল (সা.)-এর সুস্থতার শুকরিয়া স্বরূপ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অকাতরে দান-সদকা করেন। বর্ণিত রয়েছে, হযরত আবু বকর (রা.), হযরত ওমর (রা.), হযরত ওসমান (রা.) ও হযরত আলী (রা.) সহ প্রখ্যাত সাহাবিরা নিজেদের ধন-সম্পদ, দিনার ও গবাদিপশু আল্লাহর রাস্তায় অকৃপণভাবে বিলিয়ে দিয়েছিলেন।
তবে এই আনন্দের সময় বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। পরদিন মহানবী (সা.) আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। ১৫ দিন পর ১২ রবিউল আউয়ালে ইন্তেকাল করেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)- ইসলামি ইতিহাসে যে ঘটনা মুসলিম উম্মাহর জন্য গভীর শোকের অধ্যায় হয়ে আছে।
আখেরি চাহার সোম্বার সঙ্গে তাই আনন্দ ও বেদনার দুই স্মৃতি একসঙ্গে জড়িয়ে আছে। একদিকে এটি মহানবী (সা.)-এর সাময়িক সুস্থতা এবং সাহাবিদের স্বস্তির স্মরণ; অন্যদিকে এর পরপরই তাঁর অসুস্থতা ফিরে আসা মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাবিধুর অধ্যায়ের সূচনা করে।
ঐতিহাসিক সেই আনন্দঘন মুহূর্ত ও সাহাবিদের মহান ত্যাগের ঘটনাকে স্মরণ করেই পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশসহ বিশ্বজুড়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এ দিনে নফল ইবাদত, জিকির-আজকার ও বেশি বেশি দান-সদকা করার মাধ্যমে দিনটিকে স্মরণ করে থাকেন। মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের দিন হিসেবেও অনেকে এটিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
তবে ইসলামি পণ্ডিত ও সিরাত গবেষকদের মধ্যে এ দিনকে কেন্দ্র করে বিশেষ কোনো নির্দিষ্ট ইবাদত বা আনুষ্ঠানিকতা শরিয়তে নির্ধারিত কি না, সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। সাধারণ নফল ইবাদত, দোয়া, জিকির ও দান-সদকা ইসলামে স্বীকৃত আমল হলেও আখেরি চাহার সোম্বার জন্য আলাদা কোনো বিশেষ ইবাদতকে বাধ্যতামূলক বা নির্ধারিত আমল হিসেবে গণ্য করা হয় না। তাই দিনটির মূল তাৎপর্য মহানবী (সা.)-এর জীবনের সেই স্মরণীয় সময় এবং তাঁর প্রতি মুসলমানদের ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার অনুভূতির মধ্যেই নিহিত।
বাংলাদেশেও দিনটি ধর্মীয় গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করা হয়। ২০২৬ সালে আখেরি চাহার সোম্বা পালিত হচ্ছে ১২ আগস্ট, বুধবার। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এ উপলক্ষে বন্ধ রয়েছে। তবে দিনটি সরকারি সাধারণ ছুটির তালিকায় নেই; এটি ঐচ্ছিক ছুটির আওতাভুক্ত।
আখেরি চাহার সোম্বা তাই মুসলিম সমাজে শুধু একটি দিন হিসেবে নয়, মহানবী (সা.)-এর শেষ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি হিসেবে বিবেচিত। দীর্ঘ অসুস্থতার মধ্যে তাঁর সাময়িক সুস্থতার খবর যেমন সাহাবিদের মনে আনন্দ এনেছিল, তেমনি অল্প সময়ের মধ্যেই ফিরে আসা অসুস্থতা মনে করিয়ে দিয়েছিল পৃথিবীতে তাঁর শেষ সময় যে ঘনিয়ে এসেছিল। সেই স্মৃতিকে ঘিরেই প্রতি বছর সফর মাসের শেষ বুধবারে দিনটি স্মরণ করেন মুসলমানরা।
এসি//