আন্তর্জাতিক

শিশুহত্যার দায়ে ফাঁসি, ১১৯ বছর পর উঠল নতুন প্রশ্ন

ওয়েলসের ইতিহাসে ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া সর্বশেষ নারী লেসলি জেমস। ১৯০৭ সালে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ১১৯ বছর পর নতুন একটি বইয়ে সামনে এসেছে সেই মামলার নানা অজানা দিক। লেখক মেরি জোনসের দাবি, লেসলির মাথায় গুরুতর আঘাতের বিষয়টি বিচারপ্রক্রিয়ায় যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। এমনকি যে শিশুকে হত্যার দায়ে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল, সেই হত্যাকাণ্ড ইচ্ছাকৃত ছিল কি না, তা নিয়েও রয়েছে গুরুতর প্রশ্ন।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সময়টা ১৯০৭ সালের ১৪ আগস্ট। সেদিন ছিল লেসলি জেমসের ৪০তম জন্মদিন। জন্মদিনের সকালেই তাকে কার্ডিফ কারাগারের ফাঁসির মঞ্চে নেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মধ্য দিয়ে ওয়েলসের ইতিহাসে ফাঁসিতে ঝোলানো সর্বশেষ নারী হিসেবে তার নাম ইতিহাসে যুক্ত হয়।

এর আগে ওই বছরের জুনে মাত্র এক দিন বয়সী এক কন্যাশিশুকে ইচ্ছাকৃতভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যার অভিযোগ ওঠে লেসলির বিরুদ্ধে। সে সময় পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে অর্থের বিনিময়ে অনাকাঙ্ক্ষিত শিশুদের দেখাশোনার সঙ্গে যুক্ত একটি চক্রের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।

তবে নতুন বইয়ে পুরো ঘটনাটির ভিন্ন একটি চিত্র সামনে এনেছেন লেখক মেরি জোনস। তার অনুসন্ধান অনুযায়ী, লেসলি জেমসের প্রকৃত নাম সম্ভবত রোডা উইলিস। ঘটনার কয়েক মাস আগে সাইকেলের ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন তিনি। মাথায় আঘাত পাওয়ার পর প্রায় তিন মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীনও ছিলেন। কিন্তু সেই আঘাত তার আচরণ ও মানসিক অবস্থায় কী ধরনের প্রভাব ফেলেছিল, বিচার চলাকালে তা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি বলে দাবি লেখকের।

ঘটনার সূত্রপাত একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে। বিজ্ঞাপন দেখে এক নারীর কাছ থেকে শিশুটির দায়িত্ব নিয়েছিলেন লেসলি। এর বিনিময়ে তাকে প্রথমে ছয় পাউন্ড এবং পরে আরও দুই পাউন্ড দেওয়ার কথা ছিল। শিশুটিকে নিয়ে ট্রেনে করে কার্ডিফে ফেরার পথেই তার মৃত্যু হয়।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ ছিল, লেসলি ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছেন। কিন্তু নতুন বইয়ে এমন কিছু তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, যা সেই অভিযোগকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।

লেখকের দাবি, শিশুটিকে লেসলির কাছে দেওয়ার আগেই তার পরিবারের সদস্যরা পুলিশকে জানিয়েছিলেন, শিশুটির মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছিল। শিশুটিকে খুব শক্ত করে কাপড়ে জড়িয়েও রাখা হয়েছিল। ফলে শ্বাসরোধের পরিবর্তে দম বন্ধ হয়ে শিশুটির মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

লেসলির বিচারও ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। মাত্র দেড় দিন চলা বিচারের পর ১২ সদস্যের পুরুষ জুরি মাত্র ১২ মিনিটের আলোচনায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করেন।

মেরি জোনসের দাবি, লেসলির পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছিল বিচারের দিন সকালেই। ফলে মামলাটি প্রস্তুত করা, সাক্ষীদের হাজির করা কিংবা কার্যকরভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য তার আইনজীবীর হাতে পর্যাপ্ত সময় ছিল না।

তবে লেসলির বিরুদ্ধে আরও দুটি শিশুকে একইভাবে দায়িত্ব নেওয়ার অভিযোগও বিচারে সামনে আনা হয়েছিল। এসব অভিযোগকে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যদিও বইটিতে বলা হয়েছে, প্রথম শিশুটির ক্ষেত্রে লেসলি চিকিৎসা সহায়তা চেয়ে একটি নোট রেখে গিয়েছিলেন। আর দ্বিতীয় শিশুটি পরবর্তীতে তার বাড়িওয়ালির কাছে দত্তক যায় এবং সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে।

লেসলির মৃত্যুদণ্ড ঠেকাতে সে সময় বড় ধরনের জনমত তৈরি হয়েছিল। কার্ডিফ নগর কর্তৃপক্ষ, তার আইনজীবী এবং সাধারণ মানুষ মিলে প্রায় ৫০ হাজার স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছিলেন ক্ষমার দাবিতে। এমনকি তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরের অপেক্ষায় কারাগারের বাইরে জড়ো হয়েছিলেন প্রায় এক হাজার মানুষ।

তবু শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ঠেকানো যায়নি। নতুন বইয়ে বলা হয়েছে, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হারবার্ট গ্ল্যাডস্টোন দক্ষিণ ওয়েলসে অর্থের বিনিময়ে শিশুদের দায়িত্ব নেওয়ার প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য লেসলির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেন।

তবে ১১৯ বছর পরও সেই মামলার সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি রয়ে গেছে—শিশুটি লেসলির হেফাজতে থাকাকালে মারা গিয়েছিল, এতে সন্দেহ না থাকলেও তাকে কি সত্যিই ইচ্ছাকৃত হত্যার জন্য দায়ী করা যায়?

মেরি জোনসের মতে, শিশুটির মৃত্যুতে লেসলির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তিনি পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছিলেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট প্রমাণ ছিল না। সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত হত্যার অভিযোগ বিবেচনা করা যেতে পারত বলে মনে করেন তিনি।

লেসলির মামলাকে ঘিরে সেই সময়ের সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও বইটিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তার অপরাধের চেয়ে তার সৌন্দর্য, চুলের রং এবং ফাঁসির মঞ্চে তার শান্ত আচরণ নিয়েই বেশি আলোচনা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। লেখকের মতে, নারী হওয়ার কারণেও তাকে ঘিরে তৎকালীন সমাজে এক ধরনের নারী বিদ্বেষী দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করেছিল।

সময় পেরিয়ে গেছে এক শতাব্দীরও বেশি। তবু লেসলি জেমসের কাহিনি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। কার্ডিফ কারাগারের ভেতরে আজও তার কবরের একমাত্র চিহ্ন হিসেবে রয়েছে একটি খোদাই করা ক্রুশচিহ্ন। আর নতুন এই বই তার মৃত্যুদণ্ডের সেই পুরোনো মামলাকেই আবারও সামনে এনেছে—অপরাধ, বিচার ও ন্যায়বিচারের মাঝখানে আসলে কতটা সত্য চাপা পড়ে থাকতে পারে, সেই প্রশ্ন নিয়ে।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন