দেশজুড়ে

রংপুরে নৃশংস ৪ খুন: পুলিশ-আসামির একই শার্ট ঘিরে রহস্য

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই সন্দেহভাজনের একজনের পরনের শার্ট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে। মরদেহ উদ্ধারের দিন একই ধরনের শার্ট পরা অবস্থায় পুলিশের এক কর্মকর্তাকে দেখা যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় বিভিন্ন ফেসবুক পেজের সরাসরি সম্প্রচার করা ভিডিওতে দেখা যায়, মরদেহ উদ্ধারের সময় একজন ব্যক্তি ওই ধরনের শার্ট পরে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছেন। তার মুখে মাস্ক ছিল। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে জানান, একই ধরনের শার্ট একাধিক ব্যক্তি পরতে পারেন।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের দুজনের বাড়িই মাছুয়াপাড়া এলাকায়। পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পরও তারা কিছু সময় ওই বাড়িতে অবস্থান করেন এবং সেখানে মাদক সেবন করেন।

রোববার (২৩ আগস্ট) ভোরে তাদের গ্রেপ্তারের পর বিকেলে আদালতে হাজির করা হয়। মুখ্য মহানগর হাকিম মো. রফিকুল ইসলামের খাসকামরায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দুই যুবকের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। আদালতে তারা হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক মিলন চ্যাটার্জি জানান, দুই আসামি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করায় তাদের নতুন করে রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। জবানবন্দিতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে সব তথ্য এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না। ঘটনায় আর কেউ জড়িত আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ মাদক সংগ্রহ করে একটি বাসায় বসে তা সেবন করেন। পরে রাতের শেষ দিকে তারা পাশের একটি নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান। সেখানে মাদক সেবনের সময় শব্দ হলে গণপতি ছাদে উঠে তাদের দেখতে পান। পুলিশ বলছে, এ সময় তিনি তাদের বকাঝকা করলে মাদক সেবনের বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় দুই যুবক।

একপর্যায়ে গামছা দিয়ে গণপতির গলায় পেঁচিয়ে ধরলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। তার চিৎকার শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা এগিয়ে এলে সিঁড়ির কাছে তাকেও শ্বাসরোধ করা হয়। পরে মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এবং ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি। প্রিয়ম আসামিদের চিনত এবং ঘটনা প্রকাশ করে দিতে পারে—এমন আশঙ্কায় তাকেও হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তবে পুলিশের এই বিবরণ নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। পাশের নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনের ফাঁকা জায়গা ও ছাদ থাকা সত্ত্বেও কেন দুই যুবক গণপতির বাড়ির ছাদে গিয়ে মাদক সেবন করছিলেন—সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদের কাছে এমন প্রশ্ন করা হয়। তিনি বলেন, তদন্তে অল্প সময়ের মধ্যেই পুলিশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে এবং তদন্তের ফলাফলের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানান।

হত্যাকাণ্ডের পর দুই যুবক ওই বাড়িতে অবস্থান করে গোসল করেন, আবার মাদক সেবন করেন এবং ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর খান বলে পুলিশ জানিয়েছে। মাদকের প্রভাব কমাতে ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খাওয়ার তথ্যও তদন্তে পাওয়া গেছে।

পরে ঘরের আসবাবপত্র, আলমারি, শোকেস ও কাপড়চোপড় এলোমেলো করে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে হত্যাকাণ্ডকে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয় বলে পুলিশ মনে করছে। ঘর থেকে স্বর্ণালংকারও নেওয়া হয়। একটি স্বর্ণের চুড়ি আগুনে পরীক্ষার আলামত পাওয়ার পর তদন্তে সিদ্ধার্থের নাম আরও জোরালোভাবে সামনে আসে। সে একটি সোনার দোকানে কাজ করায় স্বর্ণ পরীক্ষার বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা ছিল। পরে আসামিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী একটি পরিত্যক্ত স্থান থেকে স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ আরও জানায়, বাড়ির দুটি মুঠোফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল। আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যেই এমনটি করা হয়ে থাকতে পারে বলে তদন্তকারীদের ধারণা। ঘটনাস্থল থেকে মাদক সেবনের আলামত, খেজুরের বিচি ও কামড় দেওয়া শসা উদ্ধার করা হয়েছে। খেজুরের বিচি পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

এর আগে শনিবার রাতে মাছুয়াপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা, ২৫ বছর বয়সী মেয়ে প্রার্থী এবং ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মামলার এজাহার অনুযায়ী, শুক্রবার রাত ২টা ৪০ মিনিট থেকে শনিবার রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে কোনো একসময় হত্যাকাণ্ড ঘটে।

শনিবার রাতে প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পরিবারের কাউকে ফোনে পাননি। পরে স্বামী বিপুল আচার্যকে সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে গিয়ে ভেতরে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে সন্দেহ করেন। প্রতিবেশীর বাড়ির ওপর দিয়ে ছাদে উঠে জানালার তালা ভাঙার পর ঘরের ভেতরে জিনিসপত্র এলোমেলো এবং পচা গন্ধ দেখতে ও পেতে পান। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

এদিকে রোববার সন্ধ্যায় চার মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে ফরেনসিক বিভাগ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে নতুন তথ্য দিয়েছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানান, প্রাথমিকভাবে চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

ময়নাতদন্তে নিহত প্রার্থী চক্রবর্তীর চোয়াল ভাঙার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। মুখমণ্ডলের বিকৃতির কারণ হিসেবে পচন ধরার বিষয়টি পাওয়া গেছে। সেখানে অ্যাসিড বা অন্য কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের চিহ্নও মেলেনি।

চারটি মরদেহ থেকেই প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব নমুনা সিআইডির ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে। পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত মতামত দেওয়া হবে।

এ ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন। একই সঙ্গে তদন্তে যুক্ত কর্মকর্তাদের পরিচয় নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্তে ধর্মীয় পরিচয় কোনো বিবেচ্য বিষয় নয় এবং কর্মকর্তাদের পরিচয়ের মিলটি কেবলই কাকতালীয়।

এখন দুই আসামির আদালতে দেওয়া জবানবন্দি, ফরেনসিক পরীক্ষার ফল এবং ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আলামত বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের পুরো রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন