বিদ্রোহ থেকে মানবতা : পাঁচ দশক পরও আলোচনায় নজরুল
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ নন; তাঁরা হয়ে ওঠেন সব সময়ের প্রেরণার উৎস। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তেমনই এক অনন্য নাম। ১৯৭৬ সালের ২৭ আগস্ট তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণের পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও তাঁর সাহিত্য, চিন্তা ও আদর্শ আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও আলোচিত। বিদ্রোহ, সাম্য, মানবতা এবং অসাম্প্রদায়িকতার যে শক্তিশালী বার্তা তিনি তাঁর রচনা ও জীবনের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন, তা আজও সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা সংকট ও প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
তবে নজরুলকে শুধু ‘বিদ্রোহী কবি’ পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তাঁর চিন্তা ও সৃষ্টির বিস্তৃত পরিসরকে পুরোপুরি উপলব্ধি করা যায় না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন অবস্থান যেমন তাঁকে বিদ্রোহের প্রতীক করেছে, তেমনি মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা, সাম্যের আহ্বান এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা তাঁকে মানবতার কবি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে। এ কারণেই তাঁর প্রয়াণের ৫০ বছর পরও তাঁকে ঘিরে আলোচনা থেমে নেই।
১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। শৈশবের দারিদ্র্য, সংগ্রাম ও বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্য ও চিন্তাধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। কৈশোরে লেটো দলে কাজ করা থেকে শুরু করে সেনাবাহিনীতে যোগদান, জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতাগুলোই পরবর্তীতে তাঁর লেখনীকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
বাংলা সাহিত্যে নজরুলের আবির্ভাব ছিল এক ঝড়ের মতো। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মাধ্যমে তিনি কেবল সাহিত্যপ্রেমীদেরই নয়, পুরো বাঙালি সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর কবিতায় একদিকে যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি মানুষের মুক্তি, ভালোবাসা ও মর্যাদার কথাও উঠে এসেছে। ‘সাম্যবাদী’, ‘কুলি মজুর’, ‘মানুষ’ কিংবা ‘দারিদ্র্য’ কবিতাগুলোতে নিপীড়িত মানুষের প্রতি তাঁর গভীর সহমর্মিতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিদ্রোহের মধ্য দিয়েই তিনি শেষ পর্যন্ত মানবমুক্তি ও সাম্যের সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন।
নজরুলকে শুধু ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে দেখলে তাঁর অবদানকে ছোট করে দেখা হবে। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক। বাংলা গানে তিনি নতুন ধারা সৃষ্টি করেন, যা আজ ‘নজরুলসংগীত’ নামে স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করছে। প্রেম, প্রকৃতি, দেশপ্রেম, আধ্যাত্মিকতা, বিদ্রোহ ও মানবতার মতো বহুমাত্রিক বিষয় তাঁর গানে স্থান পেয়েছে।
ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রশ্নে নজরুল ছিলেন সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। তিনি ইসলামী গান যেমন লিখেছেন, তেমনি শ্যামাসংগীত ও ভক্তিগীতিও রচনা করেছেন সমান দক্ষতায়। তাঁর সাহিত্য ও সংগীতে ইসলামি ঐতিহ্য, হিন্দু পুরাণ ও বাঙালির লোকজ সংস্কৃতি একসঙ্গে মিশে গেছে। ধর্মের পরিচয়ের আগে তিনি মানুষের পরিচয়কে বড় করে দেখেছেন। ফলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আলোচনায় নজরুল এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।
সাংবাদিক হিসেবেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ‘ধূমকেতু’ ও ‘লাঙল’-এর মতো পত্রিকার মাধ্যমে তিনি ঔপনিবেশিক শাসন, সামাজিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হন। তাঁর লেখার কারণে ব্রিটিশ সরকার একাধিকবার তাঁর প্রকাশনা বন্ধ করে দেয় এবং তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। কারাগারে থেকেও তিনি প্রতিবাদ চালিয়ে যান, যা তাঁকে রাজনৈতিক সচেতনতার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
চলচ্চিত্রের সঙ্গেও নজরুলের সম্পৃক্ততা ছিল। ১৯৩৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ধ্রুব’ চলচ্চিত্রে তিনি যৌথভাবে পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি অভিনয়, গান রচনা, সুরারোপ ও সংগীত পরিচালনার কাজও করেন। ফলে বাংলা সংস্কৃতির প্রায় প্রতিটি সৃজনশীল মাধ্যমে তাঁর উপস্থিতি দেখা যায়।
১৯৪২ সালে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে তিনি বাকশক্তি ও স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। জীবনের শেষ প্রায় তিন দশক তাঁকে নীরবতার মধ্য দিয়ে কাটাতে হলেও তাঁর সৃষ্টি থেমে থাকেনি। বরং তাঁর কবিতা, গান ও সাহিত্যকর্ম নতুন নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছেছে এবং গবেষণার বিষয় হয়ে উঠেছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্কও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ১৯৭২ সালে তাঁকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। পরবর্তীতে তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয় এবং একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধি প্রদান করে। ১৯৭৬ সালের ২৭ আগস্ট ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
পাঁচ দশক পরও নজরুলকে ঘিরে গবেষণা, চর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেমে নেই। তাঁর সাহিত্য, সংগীত ও দর্শন সংরক্ষণ, গবেষণা, প্রকাশনা এবং দেশ বিদেশে প্রচারের লক্ষ্যে ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কবি নজরুল ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠানটি নজরুলের সৃষ্টিকর্ম সংগ্রহ, সংরক্ষণ, গবেষণা এবং প্রকাশনার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে জাতীয় কবির চিন্তা ও দর্শন পৌঁছে দিতে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
অন্যদিকে জাতীয় কবির নামধারী জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ও গবেষণা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে তাঁর আদর্শকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত গবেষণা প্রকল্প, গবেষণা সপ্তাহ, সেমিনার, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং বিভিন্ন একাডেমিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে নজরুলের চিন্তা, দর্শন ও মানবিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এ বছর কবির প্রয়াণের ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে সমাজ, রাষ্ট্র ও প্রযুক্তি অনেক বদলেছে; কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানুষের মর্যাদা, ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং সাম্যের যে বার্তা নজরুল দিয়ে গেছেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর সাহিত্য কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, বর্তমানকে বোঝারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিদ্রোহ থেকে মানবতার যে পথরেখা তিনি নির্মাণ করেছিলেন, পাঁচ দশক পরও সেই পথই মানুষকে ন্যায়, সাম্য ও সহমর্মিতার দিশা দেখিয়ে চলেছে।
আই/এ