দেশে ভয়াবহ ডেঙ্গু পরিস্থিতি, প্রাথমিক লক্ষণ নিয়ে ডব্লিউএইচওর সতর্কবার্তা
বাংলাদেশে ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই এডিস মশাবাহিত রোগে মৃত্যুও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। চলতি বছরেও প্রায় প্রতিদিনই ডেঙ্গুতে প্রাণহানির খবর আসছে। ফলে রোগটি নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও জনসচেতনতা বাড়াতে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) রোগটির প্রাথমিক লক্ষণগুলো তুলে ধরে সতর্কবার্তা দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
সংস্থাটি জানিয়েছে, ডেঙ্গুর কোনো প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। এসব লক্ষণের মধ্যে রয়েছে তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, হাড়ের জোড়া ও পেশিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব, বমি এবং ত্বকে ছোট ছোট লালচে ফুসকুড়ি। এসবের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলেও দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
এদিকে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ইতোমধ্যে ২০০ ছাড়িয়েছে। শুধু সেপ্টেম্বরের প্রথম ২২ দিনেই প্রাণ গেছে ১০৪ জনের। সর্বশেষ বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, একদিনে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৬ জন। একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৬৮ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণেও দেশে ডেঙ্গুর বিস্তারের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১৮ বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছিল ২৯৬ জনের। বিপরীতে পরবর্তী ৭ বছর ৯ মাসে এই রোগে প্রাণ হারিয়েছেন ৩ হাজার ৪৬৬ জন।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ওই ৭ বছর ৯ মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৭ লাখ ৮৬ হাজার ৯১ জন। আগের দেড় যুগে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫০ হাজার ২০৮ জন। অর্থাৎ আগের দেড় যুগের তুলনায় পরবর্তী ৭ বছর ৯ মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়েছে ১১ দশমিক ৭১ গুণ। আক্রান্তের সংখ্যাও বেড়েছে ১৫ দশমিক ৬৬ গুণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এডিস মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা, আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা যথাযথভাবে নথিভুক্ত না হওয়া, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেরি করা এবং একই ব্যক্তির একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার মতো বিষয় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে এডিস মশা এখন ভালোভাবেই মানিয়ে নিয়েছে। ফলে ডেঙ্গুকে শুধু মৌসুমি রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অল্প পরিমাণ জমে থাকা পানিতেও এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। এমনকি পরিত্যক্ত ছোট পাত্রেও তৈরি হতে পারে মশার প্রজননস্থল।
একসময় শহরকেন্দ্রিক এই রোগের বিস্তার এখন গ্রামাঞ্চলেও দেখা যাচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং বারবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। একজন ব্যক্তি একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন। আগে যেসব জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডেঙ্গু সংক্রমণ খুব কম ছিল বা ছিল না, তাদের মধ্যেও এখন রোগটির বিস্তার দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু স্বল্পমেয়াদি অভিযান চালিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এডিস মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ, রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং জনসচেতনতা—সবকিছুকে সমন্বিত করে দীর্ঘমেয়াদি ও জনকেন্দ্রিক জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি গড়ে তুলতে হবে।
এসি//