অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় ঘটনার ৭ দিন আগেই
ছবি তোলা ও টিকটক ভিডিও তৈরির সূত্রে পরিচয়। সেই পরিচয় থেকেই তৈরি হয় বন্ধুত্ব। কিন্তু কয়েক মাসের এই সম্পর্কের আড়ালেই তৈরি হচ্ছিল ভয়ংকর এক পরিকল্পনা। আইফোন হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় ঘটনার সাত দিন আগেই।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর ছবি তোলার কথা বলে অপ্রতিমকে নেওয়া হয় কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায়। সেখানে আইফোন নেওয়ার পর সেটি ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে শুরু হয় কথা-কাটাকাটি। একপর্যায়ে কোদালের হাতল দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করা হয়। পরে সেখানেই মৃত্যু হয় সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর।
কুমিল্লার অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার তিন আসামির আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে এসেছে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য। তিনজনের বক্তব্যে হত্যার পরিকল্পনা, অপ্রতিমকে পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া, আইফোন নেওয়া এবং হামলার মূল ঘটনাগুলোতে বেশ কিছু মিল পাওয়া গেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের সময় কে কীভাবে ঘটনাটি দেখেছে বা অংশ নিয়েছে, সেই বর্ণনায় কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন বয়স ১৯, এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই কিশোর ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তিনটি জবানবন্দির মধ্যে হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন তুহিন।
তুহিনের জবানবন্দি অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ থেকে ছয় মাস ধরে অপ্রতিমের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। অপ্রতিম তার বন্ধু সিয়ামের মোটরসাইকেলে করে তাদের সঙ্গে ছবি তুলতে এবং টিকটক ভিডিও বানাতে বের হতো।
এই পরিচয়ের মধ্যেই অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তুহিন ও অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত এক কিশোরের আগ্রহ তৈরি হয়।
তুহিনের বক্তব্যে বলা হয়েছে, ঘটনার আগের শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের কিছুটা সামনে ওই কিশোরের সঙ্গে তার দেখা হয়। সেখানেই অপ্রতিমের আইফোন নেওয়া এবং তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরের জবানবন্দিতেও আগের শুক্রবারের ওই বৈঠকের কথা রয়েছে। তবে হত্যার পরিকল্পনার মূল দায়িত্ব সে তুহিনের ওপর দিয়েছে।
আদালতে দেওয়া বক্তব্যে সে জানিয়েছে, তুহিনই আইফোন নেওয়ার জন্য অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল।
অন্য কিশোরের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন বিকেলে তার এক বন্ধু তাকে জানায়—তুহিনের সঙ্গে মিলে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হবে।
তিন আসামির বক্তব্যের এই অংশে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে—হত্যাকাণ্ডটি হঠাৎ করে ঘটেনি। আইফোনকে কেন্দ্র করে আগেই অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
এরপর অপ্রতিমকে পাহাড়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও করা হয় পরিচিতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে।
তুহিনের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, হত্যার আগের দিন ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ময়নামতির একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। অপ্রতিম তাকে নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা দেয়। ওই রাতেই তুহিন টিকটকের মাধ্যমে অপ্রতিমকে বার্তা পাঠায়। পরে অপ্রতিম একটি মুঠোফোন নম্বর দিলে সেখানে যোগাযোগ হয়। পরদিন জুমার নামাজের পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হয়।
অপ্রতিম তার বাবার দোকানে কর্মরত কিশোরকেও একই সময়ে আসতে বলেছিল বলে তুহিনের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তাদের পরিকল্পনা ছিল একসঙ্গে ছবি তোলা। আর সেই ছবি তোলার বিষয়টিকেই অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নেওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ১৩ বছর বয়সী অপ্রতিমের চেয়ে পাঁচ থেকে ১০ বছরের বড় যুবকদের সঙ্গে তার মেলামেশা ও সম্পর্কের বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এটিকে ‘অসম বন্ধুত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা তুহিনের জবানবন্দিতে রয়েছে। এরপর তাকে বিভিন্ন কথা বলে সানন্দা পশ্চিমপাড়ার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। জায়গাটি নির্জন এবং এটি তুহিনের চাচা শাহ আলমের পাহাড় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোর জানিয়েছে, বেলা দুইটার পর কোটবাড়ির বোর্ড মার্কেট এলাকায় অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়। পরে সন্ধ্যার আগমুহূর্তে সে আরেক কিশোর বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে পাহাড়ের দিকে যায়। সেখানে যাওয়ার আগেই সে বন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানায়।
তৃতীয় কিশোরের বক্তব্যও প্রায় একই।
সে জানিয়েছে, বেলা ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে একটি স্কুলের সামনে ওই কিশোরের সঙ্গে তার দেখা হয়। সেখানেই তাকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। এরপর বিকেল চারটার পর তারা পাহাড়ে যায় এবং সেখানে অপ্রতিম ও তুহিনকে বসে থাকতে দেখে।
পাহাড়ে চারজন একত্র হওয়ার পর কিছু সময় গল্প ও আড্ডা হয়েছিল—তিন আসামির জবানবন্দিতেই এই তথ্য পাওয়া গেছে।
এরপরই মূল ঘটনা ঘটে।
দোকানে কর্মরত কিশোরের জবানবন্দি অনুযায়ী, সে অপ্রতিমের কাছে আইফোনটি চাইলে অপ্রতিম তাকে ফোন দেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সেটি তুহিনের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
তুহিনের জবানবন্দিতেও প্রায় একই ঘটনা এসেছে। ওই কিশোর অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোন নেওয়ার পর বেশ কিছুক্ষণ সেটি ব্যবহার করে। পরে ফোনটি অপ্রতিমকে ফেরত না দিয়ে তুহিনের হাতে দেয়। এরপর আইফোন নিয়ে অপ্রতিম ও তুহিনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।
পুলিশও এর আগে জানিয়েছিল, অপ্রতিম নিজের আইফোনটি ফেরত নেওয়ার চেষ্টা করলে তুহিন বাধা দেয়। এরপরই তাকে মারধর করা হয়।
তিন আসামির বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মিল হলো—অপ্রতিমকে প্রথম আঘাত করেন তুহিন।
জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, প্রথমে অপ্রতিমকে থাপ্পড় মারেন তুহিন। পরে পাশে পড়ে থাকা একটি কোদালের হাতল নিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন। এরপর অন্য দুজনকেও অপ্রতিমকে মারতে বলেন।
দোকানে কর্মরত কিশোরও জানিয়েছে, তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের ঝগড়ার একপর্যায়ে তুহিন কোদালের হাতল দিয়ে প্রথমে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন।
তৃতীয় কিশোরের বক্তব্যেও বলা হয়েছে, তুহিনই প্রথম কোদালের হাতল দিয়ে অপ্রতিমকে আঘাত করেন।
হত্যার উদ্দেশ্য নিয়েও তিন জবানবন্দিতে গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে।
তুহিন বলেছেন, অপ্রতিমের আইফোনের প্রতি তাদের লোভ হয়েছিল।
দ্বিতীয় কিশোর আদালতে দেওয়া বক্তব্যে জানিয়েছে, আইফোনটি বিক্রি করে তুহিন তাকে টাকার ভাগ দেওয়ার কথা বলেছিল। তৃতীয় কিশোরও একই ধরনের তথ্য দিয়েছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, আইফোন বিক্রি করে পাওয়া টাকা থেকে তাকে ভাগ দেওয়ার কথা ছিল।
অপ্রতিমের মৃত্যুর পর ঘটনাস্থল থেকে কে কখন এবং কোন পথে বের হয়, সে বিষয়ে তিনজনের বক্তব্যে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।
তুহিন বলেছেন, অপ্রতিম মারা যাওয়ার পর অন্য দুজন একদিকে চলে যায়। তিনি অন্যদিকে গিয়ে বাসায় ফেরেন।
দ্বিতীয় কিশোর জানিয়েছে, অপ্রতিমের মৃত্যুর পর সে ও তার বন্ধু একসঙ্গে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। তখন তুহিন সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তৃতীয় কিশোরের বক্তব্যও কাছাকাছি।
সে জানিয়েছে, সে ও তার বন্ধু একসঙ্গে চলে আসে এবং তুহিন অন্যদিকে চলে যান।
তবে অপ্রতিমের আইফোন শেষ পর্যন্ত তুহিনের কাছেই ছিল—তিন আসামির জবানবন্দিতেই এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
তুহিনের জবানবন্দিতে তার বন্ধু মো. সিয়ামের নামও এসেছে।
তুহিন জানিয়েছেন, হত্যার পর বাসায় ফিরে তিনি সিয়ামকে ফোন করে ডেকে আনেন এবং তাকে পুরো ঘটনা জানান। হত্যার পরিকল্পনার বিষয়টি সিয়াম আগে থেকেই জানতেন বলেও তুহিনের বক্তব্যে উল্লেখ রয়েছে।
তবে অন্য দুই আসামির জবানবন্দিতে হত্যার আগের পরিকল্পনার সঙ্গে সিয়ামের সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পরে পুলিশ সিয়ামকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।
পুলিশের বক্তব্য ছিল, সিয়াম সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি। তবে ঘটনা জানার পর সেটি গোপন করেছিলেন।
পুলিশ সূত্রের দাবি, হত্যার দিন রাতেই তুহিন সিয়ামের সঙ্গে দেখা করে তাকে হত্যার বিস্তারিত জানান।
জবানবন্দিতে হত্যার পরের দিনের ঘটনাও উঠে এসেছে।
তুহিন জানিয়েছেন, ১৯ সেপ্টেম্বর সকালে অপ্রতিমের মামা তাকে ফোন করে অপ্রতিমের খোঁজ করেন। এরপর তিনি সিয়ামকে সঙ্গে নিয়ে কোটবাড়ি এলাকায় অপ্রতিমকে খুঁজতে যান।
অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোর জানিয়েছে, পরদিন সে অপ্রতিমের বাবার এক সহকারীর সঙ্গে তাকে খুঁজতে বের হয়। পরে পাহাড় থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে সেও ঘটনাস্থলে যায়।
অন্য কিশোর জানিয়েছে, মরদেহ উদ্ধারের পর সন্ধ্যায় সে ও তার বন্ধু ফেসবুকে অপ্রতিমের মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দেয়।
এদিকে, অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ শুরু করে। সেসব তথ্যের ভিত্তিতে তুহিনকে শনাক্ত করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর অন্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়।
২০ সেপ্টেম্বর তিন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর পুলিশ জানায়, তাদের দেওয়া বক্তব্য অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
তিন আসামির জবানবন্দি পাশাপাশি রাখলে হত্যার পরিকল্পনা, আইফোনের প্রতি আগ্রহ, অপ্রতিমকে ছবি তোলার কথা বলে পাহাড়ে নেওয়া, ফোন নেওয়া এবং এরপর হামলার বিষয়ে বেশ কিছু মিল পাওয়া যায়। তবে প্রত্যেকের ভূমিকা ও ঘটনাস্থলে পরবর্তী কর্মকাণ্ডের বর্ণনায় পার্থক্য রয়েছে।
এসব বক্তব্যের সঙ্গে অন্যান্য সাক্ষ্য, সিসিটিভি ফুটেজ ও তদন্তে পাওয়া তথ্য মিলিয়ে হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনাক্রম এবং প্রত্যেক আসামির ভূমিকা নির্ধারণের বিষয়টি এখন তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।
এসি//