জাতীয়

উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট

পাবনা প্রতিনিধি

দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের প্রথম ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে আরও এক ধাপ এগিয়েছে। ইউনিটটির স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমন ভালভ সংক্রান্ত সব পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

 বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) এই ইউনিটের চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা)।বায়রা চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি। এ ধাপকে বলা হয় ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এখন আরও দুটি অনুমোদন নিতে হবে।

প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও প্রস্তুতি শেষ হলে আগামী ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) কর্মকর্তারা জানান, গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রথম ধাপে ১৬ দশমিক ১ মেগাপ্যাসকেল (এমপিএ) পরিচালন চাপ ও ২৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় রেখে ১২টি পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়। পরবর্তী ধাপে ১৮ দশমিক ৬৫ এমপিএ চাপে ভালভগুলোর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার শুরুতে কিছু জটিলতা দেখা দিলেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পর তা সফলভাবে শেষ হয়।

এর আগে ভালভে ত্রুটি ধরা পড়লে তা মেরামতে রাশিয়ার সহযোগিতা নেয় বাংলাদেশ। রাশিয়ার বিশেষজ্ঞরা রূপপুরে এসে একে একে নয়টি ভালভ মেরামত করেন। এরপর কয়েক ধাপে এসব ভালভের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নির্ধারিত ১৮ দশমিক ৬৫ এমপিএ চাপে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভালভ একই সঙ্গে খুলে অতিরিক্ত চাপ নির্গত করে রিঅ্যাক্টরকে নিরাপদ রাখার কথা। তবে প্রাথমিক পরীক্ষায় দুটি ভালভ খুলতে ব্যর্থ হয়। পরে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষে পরীক্ষাটি সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়।

একইভাবে ১৮ দশমিক ১ এমপিএ চাপের সময় তিনটি ভালভের মধ্যে প্রথমটি খুলে অতিরিক্ত চাপ নির্গত করার পরীক্ষাও সফল হয়েছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র জানায়, প্রধান নিয়ন্ত্রণকক্ষ (এমসিআর) ও জরুরি নিয়ন্ত্রণকক্ষ (ইসিআর)—দুই জায়গা থেকেই পরীক্ষাগুলো পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময় ভালভ খোলা ও বন্ধ হওয়ার সময়, সাড়া দেওয়ার গতি, সতর্ক সংকেত এবং চাপ ও তাপমাত্রার বিভিন্ন তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়।

রূপপুরের প্রথম ইউনিটের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরে স্থিতিশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন শুরু হবে।

অনুমোদন পাওয়ার পর ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপের মাধ্যমে রিঅ্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের কার্যকারিতা পর্যায়ক্রমে যাচাই করা হবে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরকে নির্ধারিত তাপীয় ক্ষমতার এক শতাংশেরও কম শক্তিস্তরে পরিচালনা করে প্রাথমিক ক্রিটিক্যালিটিতে নেওয়া হবে।

ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটিসহ পুরো ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগতে পারে। পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক হলে ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানো হবে।

এরপর প্রকল্পটি ‘পাওয়ার স্টার্ট-আপ’ পর্যায়ে প্রবেশ করবে। এ সময় রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়ানোর পাশাপাশি টারবাইন সিনক্রোনাইজেশন এবং জেনারেটরকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করার কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রথম ইউনিটকে নিরাপদভাবে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করে শুরুতে ৩ শতাংশ শক্তি উৎপাদন থেকে ধাপে ধাপে ২০ থেকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে।  এরপর পরীক্ষামূলকভাবে গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার পরও কয়েক মাস বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিটের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। প্রথম ইউনিট চালু হলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় যুক্ত হবে বাংলাদেশ। এর মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি পারমাণবিক প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের সক্ষমতারও নতুন অধ্যায় শুরু হবে।

প্রসঙ্গত, রূপপুর প্রকল্পের মেয়াদ দুই দফায় বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে।

আই/এ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #রূপপুর