টুকিটাকি

জৌ কুনফেই : শূন্য থেকে বিলিয়নেয়ার হয়ে ওঠার গল্প

জৌ কুনফেই : শূন্য থেকে বিলিয়নেয়ার হয়ে ওঠার গল্প
জৌ কুনফেই একজন সেল্ফ মেড বিলিয়নেয়ার। চীনের হুনান এর দারিদ্রপীড়িত শৈশব থেকে উঠে আসা জৌ এর হাতে যেন সফলতার পরশ পাথর আছে। সামান্য ফ্যাক্টরি শ্রমিক থেকে তার বিশ্বের সবচেয়ে ধনী সেল্ফ মেড বিলিয়নেয়ারদের নারীদের একজন হয়ে ওঠার গল্প সত্যিকার অর্থেই রূপকথার মত। কিন্তু বাস্তবে, জৌ এর চেষ্টা, দৃঢ় আকাঙ্ক্ষা ও পরিশ্রমই তাকে এ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। জৌ কুনফেই ২০০৩ সালে লেনস টেকনোলজি প্রতিষ্ঠা করেন। টাচস্ক্রিন প্রস্ততকারক বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এই কোম্পানিটি, বর্তমানে স্যামসাং ও অ্যাপলের মত বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে পণ্য সাপ্লাই দেয়। ২০১৫ সালে আইপিও’তে রেকর্ড করা ৯০ হাজার কর্মীর লেনস টেকনোলজির গল্প হচ্ছে, শত প্রতিকূলতার মুখে জৌ এর টিকে থাকার গল্প। প্রযুক্তি দুনিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণদের একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা জৌ, অসংখ্য মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। বিখ্যাত এই চীনা উদ্যোক্তার জন্ম হয়েছিল ১৯৭০ সালে, চীনের হুনান এর শিয়াংজিয়াং অঞ্চলে। এক দরিদ্র পরিবারের তিন সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। শ্রমিক পিতা ফ্যাক্টরিতে কাজ করার সময় দুর্ঘটনায় আংশিক দৃষ্টিশক্তি হারান। জৌ এর বয়স যখন মাত্র ৫ বছর, তিনি মা’কে হারান। পরিবারের কাজে সাহায্য করতে আর সামান্য কিছু আয়ের জন্য জৌ গবাদী পশু পালনের কাজ শুরু করেন। জীবনের গতিপথ নির্ধারণে তার পরিবারের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। কঠিন দারিদ্র্য আর কম বয়সে মাকে হারানোর পরেও, জৌ পরিবারের কাছ থেকে সফল হওয়ার দৃঢ়চেতা মনোভাব সম্পর্কে শিক্ষা পেয়েছিলেন। বাবার দুর্ঘটনা এবং মায়ের মৃত্যু থেকে জৌ অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন পরিবারের জন্য সংগ্রাম করার। জৌ কুনফেই এর ক্যারিয়ারে সফলতার গল্প আছে বেশ কয়েকটি। ১৬ বছর বয়সে জৌ মাধ্যমিক স্কুল থেকে ড্রপ আউট হন। এরপর অভিবাসী কর্মী হিসেবে শেনজেন এ চলে যান। এ সময় তিনি শেনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে অবস্থিত কয়েকটি কোম্পানির জন্য কাজ করতেন। এর পাশাপাশি কিছু পার্টটাইম কোর্সও করতেন, যদিও তার ডিপ্লোমা ডিগ্রি ছিল না। হিসাবরক্ষণ, কম্পিউটার পরিচালনা, কাস্টমস এবং বাণিজ্যিক যানবাহন ড্রাইভিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন জৌ। স্বপ্ন দেখতেন ফ্যাশন ডিজাইনার হওয়ার। যদিও সেটা হয়ে ওঠেনি। তিনি এরপর ঘড়ির যন্ত্রাংশ তৈরির একটি কারখানায় কাজ করতে শুরু করেন। কোম্পানির পরিবেশ পছন্দ না হওয়ায়, চাকরি ছেড়ে দেন। তবে ফ্যাক্টরির প্রধান জৌ এর মধ্যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন। তিনি তাকে পদোন্নতির প্রস্তাব দেন। মাত্র ২২ বছর বয়সে ১৯৯৩ সালে জৌ নিজের কোম্পানি শুরু করেন। এ সময় তার বিনিয়োগ ছিল ২০ হাজার হংকং ডলার বা ৩ হাজার মার্কিন ডলার। তার কোম্পানি উচ্চমানের লেন্স তৈরি করত। কাজের উন্নত মানের কারণে ক্রমেই ক্রেতাদের কাছে জৌ এর কোম্পানির পণ্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ২০০১ সালে জৌ এর কোম্পানির জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগটি আসে। এ সময় তারা মোবাইল প্রস্ততকারক কোম্পানি টিসিএল কর্পোরেশনের ফোনের স্ক্রিন তৈরির কাজ পায়। এই সফলতা থেকে ২০০৩ সালে জন্ম নেয় টাচস্ক্রিন তৈরির একটি বিশেষায়িত কোম্পানি, যার নাম লেন্স টেকনোলজি। জৌ এর কোম্পানি ততদিনে এইচটিসি, নোকিয়া ও স্যামসাং এর মত প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির জন্য কাজ করতে শুরু করেছে। তারপর ২০০৭ সালে যখন অ্যাপল যাত্রা শুরু করে, লেন্স টেকনোলজি আইফোনের টাচস্ক্রিন তৈরি করার কাজ পায়, যা তারা এখনো করে আসছে। জৌ কুনফেই এর উদ্যোক্তা পরিচয়ের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তিনি লেন্স টেকনোলজির প্রতিষ্ঠাতা। এই শীর্ষস্থানীয় টাচ-স্ক্রিন প্রস্ততকারক কোম্পানিটি অ্যাপল, স্যামসাং এবং হুয়াওয়ের মত টেকজায়ান্টদের পণ্য সাপ্লাই দিয়ে থাকে। ২০০৩ সালে তিনি শেনজেন লেন্স টেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেড নামে আরেকটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এটিও একটি বিশেষায়িত কোম্পানি যারা বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশের জন্য কাচ এবং স্যাফায়ার ক্রিস্টাল স্ক্রিন তৈরি করে। লেন্স টেকনোলজিকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় টাচ স্ক্রিন কোম্পানির একটি হিসাবে গড়ে তোলাই হচ্ছে জৌ কুনফে এর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য। আইফোন, অ্যাপল ওয়াচসহ অ্যাপলের নানা ডিভাইসে এখন জৌ এর কোম্পানির টাচস্ক্রিন ব্যবহার করা হয়। অবিশ্বাস্য সফলতার জন্য অনেক নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে জৌ একজন রোল মডেল। বিশেষ করে তথ্য প্রযুক্তি সেক্টরে কাজ করা নারীদের জন্য তিনি বিশাল অনুপ্রেরণা। বাজারের সুযোগ বুঝতে পারার ক্ষেত্রে জৌ এর অসাধারণ দক্ষতা আছে। ব্যবসার কাজ নিজেই দেখভাল করা আর গুণের বিষয়ে আপস না করা হচ্ছে তার দুটি বড় বৈশিষ্ট্য। ক্যারিয়ারে অবিশ্বাস্য সফলতার কারণে জৌ অসংখ্য পুরস্কার এবং সন্মাননা পেয়েছেন। ফোর্বসের বিচারে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাবানদের একজন এবং অন্যতম ধনী সেল্ফ মেড নারী বিলিয়নেয়ার হওয়ার স্বীকৃতি পেয়েছেন। ফরচুন এর দৃষ্টিতে তিনি এশিয়া-প্যাসিফিক এর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী নারীর স্বীকৃতিও অর্জন করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে জৌ কুনফেই বিয়ে করেছিলেন তার আগের ফ্যাক্টরির বসকে। বিচ্ছেদের আগে এই সংসারে জৌ এর একটি মেয়ে সন্তান ছিল। এরপরে জৌ ২০০৮ সালে তার ফ্যাক্টরির সহকর্মী জেং জুংলাংকে বিয়ে করেন। তাদের একটি ছেলে সন্তান আছে। জৌ এর শখ হচ্ছে কাজ করা। এছাড়া তিনি পর্বত আরোহন এবং পিংপং খেলতে পছন্দ করেন। জৌ এর সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে চীনের সবচেয়ে সফল উদ্যোক্তা হবার কাহিনি চীনের লাখ লাখ শ্রমিকদের প্রেরণার উৎস। বর্তমানে জৌ কুনফেই এর মোট সম্পদের পরিমাণ ৬.৭২ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বের তাবৎ বিলিয়নেয়ারদের মধ্যে তার অবস্থান ৪১৫ তম। জৌ কুনফে এই সফলতার কারণ হিসেবে তার শেখার অদম্য ইচ্ছার কথা বলেন। মাধ্যমিক স্কুলের পড়াশোনা শেষ করতে না পারলেও, তিনি অনেকগুলি পার্ট টাইম কোর্স করেছেন এবং বিভিন্ন বিষয়ের ওপর পড়াশোনা করেছেন। এর মধ্যে আছে অ্যাকাউন্টিং, কম্পিউটার চালানো, শুল্ক প্রক্রিয়াকরণ এবং বাণিজ্যিক যানবাহন ড্রাইভিং বিষয়ক প্রশিক্ষণ। বিচিত্র ধরনের দক্ষতাই উদ্যোক্তা হিসেবে জৌ এর মূলভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। জৌ বলেন, “উদ্যোক্তা জীবনে বাধা এলে অধিকাংশ মানুষের আত্মবিশ্বাসে বড় আঘাত আসে। কিন্তু সফলতার আসল কথা হচ্ছে লেগে থাকা, বিশেষ করে সবচেয়ে কঠিন সময়ে লেগে থাকা।” জৌ এর কঠোরতার জন্য এই ইন্ডাস্ট্রির লোকজন তাকে “ব্রাদার ফেই” নামে ডাকে। অনেকে বলেন, তিনি আসলে পুরুষদের চেয়েও কঠিন। তিনি একবার কোম্পানির ২০ জন এক্সিকিউটিভদের নিয়ে দল-গঠন বিষয়ে প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে, সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৫,০০০ ফুট উঁচু চীনের ডাওয়েই পর্বতারোহনে যান। তার এক্সিকিউটিভদের অনেকেই অর্ধেক পথে হাল ছেড়ে দেন। তবে জৌ এর কথা ছিল কোনো মতেই থামা যাবে না। “কারণ মাঝপথে যখন হাল ছেড়ে দেন, আপনার মধ্যে আর প্রথম থেকে শুরু করার উদ্যম থাকে না। আমরা যখন কাজে লেগে থাকি, তখনই সফল হই। তাই বাধা পেয়ে কখনও হাল ছেড়ে দেবেন না”, তিনি বলেন। অবিশ্বাস্য ধনসম্পদ ও সফলতার পরেও, তাকে বর্ণনা করা হয় "মিষ্টি ব্যবহার এবং নম্রতা" সম্পন্ন একজন লিডার হিসেবে। "আমি উচ্চপদবির ব্যক্তি হওয়ার যোগ্যতা রাখি না", এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন। "আমি মনে করি সফল হলে অহংকারে ভাসতে না দেওয়া এবং খারাপ সময়ে হতাশায় না জড়িয়ে পড়াই জরুরী।" তার মতে, এটি তার বাবার কাছ থেকে শেখা মূল্যবান শিক্ষা।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন জৌ | কুনফেই | | শূন্য | বিলিয়নেয়ার | হয়ে | ওঠার | গল্প