ভোটগ্রহণ শুরু, গণতন্ত্রের পথে নতুন যাত্রা
আজ ১২ ফেব্রুয়ারি—দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংবিধান সংস্কার–সংক্রান্ত ঐতিহাসিক গণভোট। সকাল সাড়ে ৭টায় দেশের ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে, যা চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। গণভোট যুক্ত হওয়ায় ভোটের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। ৩০০ আসনের মধ্যে শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে ভোট স্থগিত রয়েছে।
সারা দেশে আজ সাধারণ ছুটি। বন্ধ রয়েছে শপিং মলসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। রাজধানী থেকে গ্রাম—সব জায়গায়ই ভোটের আমেজ। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর এই প্রথম সাধারণ নির্বাচন হওয়ায় রাজনৈতিক গুরুত্বও ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।
ভোটার, কেন্দ্র ও নিরাপত্তা
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন। বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রায় সাড়ে ৪ কোটি তরুণ ভোটার ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।
দেশজুড়ে ভোট হচ্ছে ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে। প্রায় অর্ধেক কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে নির্বাচন কমিশন। ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে বসানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মোতায়েন রয়েছে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চসংখ্যক নিরাপত্তা সদস্য—মোট ৯ লাখ ৫৮ হাজার। তাদের মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যই ১ লাখ ৮ হাজারের বেশি। দায়িত্বে রয়েছেন ২ হাজার ১০০ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৬৫৭ বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট।
নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হাতে দেয়া হয়েছে ২৫ হাজার ৭০০টি বডি-ওর্ন ক্যামেরা। যেকোনো বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতার তথ্য দ্রুত জানাতে চালু আছে ‘নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ’ এবং অভিযোগের জন্য হটলাইন নম্বর ৩৩৩। ইসিতে খোলা হয়েছে বিশেষ নিয়ন্ত্রণকক্ষ।
নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় মাঠে রয়েছেন ৬৯ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা, ৯৫৮ জন সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, ৪৩ হাজার ৭৮ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, ২ লাখ ৪৭ হাজার ৮৬২ জন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং ৫ লাখের বেশি পোলিং কর্মকর্তা।
দল ও প্রার্থীর চিত্র
২০০৮ সালে নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরুর পর এবারই সর্বোচ্চসংখ্যক রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে নির্বাচনে। মোট ৫১টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে (অন্য তথ্যে অংশগ্রহণকারী দল ৫০টি উল্লেখ রয়েছে)। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ বড় দলগুলো মাঠে রয়েছে। মোট প্রার্থী ২ হাজার ২৯ জন (অন্য হিসেবে ২ হাজার ২৮ জন); এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৪ জন (অন্য হিসেবে ২৭৩)। নারী প্রার্থী রয়েছেন ৮০ জন (অন্য হিসেবে ৮৩ জন)। বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১১৯টি নির্বাচনী প্রতীক।
দলভিত্তিক প্রার্থীসংখ্যায় এগিয়ে বিএনপি—২৯১ জন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৮ জন, জামায়াতে ইসলামী ২২৪ জন (ইসির হিসাবে ২২৮), জাতীয় পার্টি ২০০ জন, গণঅধিকার পরিষদ ৯৪ জন এবং এনসিপি ৩২ জন প্রার্থী দিয়েছে।
৬০টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় তারা ভোটে নেই। এছাড়া জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এমএল), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, তৃণমূল বিএনপি ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিএনএম) নির্বাচনে অংশ নেয়নি।
পোস্টাল ব্যালট ও প্রবাসী ভোট
প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন। এক হিসাবে ৪ লাখ ২২ হাজার ৯৬০টি প্রবাসী ব্যালট দেশে পৌঁছেছে; এর মধ্যে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২ লাখ ৭০ হাজার ৩৮টি গ্রহণ করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। অন্য হিসাবে, বিশ্বের ১২০টির বেশি দেশ থেকে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ১৯২ জন পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিয়েছেন, যার মধ্যে প্রবাসী ৫ লাখ ২৬ হাজার ৩৭৬ জন। ইতোমধ্যে ৯ লাখ ৬৩ হাজার ৩১৮টি ব্যালট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছেছে। আজ বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে পৌঁছানো ব্যালটই গণনায় যুক্ত হবে।
পোস্টাল ভোটদাতাদের মধ্যে ৬ লাখ ১১ হাজার ৮১৬ জন সরকারি কর্মচারী, পোলিং কর্মকর্তা ও বন্দি রয়েছেন। ২৯৯টি কেন্দ্রে পোস্টাল ভোট গণনা করা হবে এবং এগুলো মূল ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত হবে।
পর্যবেক্ষণ ও গণমাধ্যম
নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ঢাকায় এসেছেন ৩৯৪ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও ১৯৭ জন বিদেশি সাংবাদিক—অন্য তথ্যে বিদেশি পর্যবেক্ষক প্রায় ৩৫০ এবং দেশি পর্যবেক্ষক ৪৫ হাজার ৩৩০ জনের কথা বলা হয়েছে। নিবন্ধিত সাংবাদিকের সংখ্যা প্রায় ৯ হাজার ৭০০, যার মধ্যে ১৫৬ জন বিদেশি। ইসি জানিয়েছে, নির্ধারিত নীতিমালা মেনেই সবাই দায়িত্ব পালন করবেন।
ফলাফল ও প্রত্যাশা
ভোটগ্রহণ শেষে কেন্দ্রেই শুরু হবে গণনা। সংসদ নির্বাচন ও গণভোট—দুটি ব্যালট একসঙ্গে গণনা করা হবে। কেন্দ্রভিত্তিক ফল নোটিশ বোর্ডে টানানো হবে এবং ধাপে ধাপে তা রিটার্নিং কর্মকর্তার মাধ্যমে কমিশনে পাঠানো হবে। ইসি আশা করছে, অধিকাংশ আসনের ফল মধ্যরাতের মধ্যে জানা যেতে পারে এবং ১৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই চূড়ান্ত ফল ঘোষণা সম্ভব।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংস্কারের পর আয়োজিত এই নির্বাচন ঘিরে যেমন সতর্কতা, তেমনি উচ্ছ্বাসও স্পষ্ট। গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে আজ দেশের মানুষ ব্যালটের মাধ্যমে নিজেদের মত প্রকাশ করছেন। এখন নজর সবার—ভোটের শান্তিপূর্ণ সমাপ্তি ও ফলাফলের দিকে।
এসি//