যে পার্কে খোঁজা হয় জীবনসঙ্গী!
পড়ন্ত বিকেলের পার্কে কেউ হাঁটতে যায়, কেউ আড্ডা দিতে- কিন্তু চীনের সাংহাইয়ে এমন এক পার্ক আছে, যেখানে বাবা-মায়েরা যান সন্তানের বিয়ের বাজার বসাতে! প্রেম নয়, আগে বায়োডাটা; ফুল নয়, আগে ফ্ল্যাট—এ যেন সম্পর্কের খোঁজে একেবারে বাস্তবতার খোলা মেলা।
সাংহাইয়ের পিপলস পার্কে সপ্তাহান্তের পড়ন্ত বিকেল মানেই এক ব্যতিক্রমী আয়োজন। পার্কজুড়ে ঝুলতে দেখা যায় অসংখ্য জীবনবৃত্তান্ত। কোথাও লেখা বয়স, উচ্চতা, বেতন, চাকরির ধরন আবার কোথাও উল্লেখ থাকে নিজের ফ্ল্যাট আছে কি না। প্রথম দেখায় বিষয়টি অদ্ভুত মনে হলেও, এখানকার দর্শনার্থীদের কাছে এটি বেশ স্বাভাবিক দৃশ্য।

পার্কে আসা অভিভাবকরা থেমে থেমে এসব তথ্য পড়েন, আলোচনা করেন, নানা প্রশ্ন তোলেন—মেয়েটি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে, ছেলের চাকরি স্থায়ী কি না, নিজস্ব অ্যাপার্টমেন্ট আছে কি না। সবকিছু পছন্দ হলে বিনিময় হয় ফোন নম্বর। তবে মজার বিষয় হলো, যাদের নিয়ে এত আলোচনা, সেই ছেলে বা মেয়েরা সাধারণত সেখানে উপস্থিতই থাকেন না।
চীনের বড় শহরগুলোতে এ ধরনের ‘ম্যারেজ মার্কেট’ এখন বেশ পরিচিত হলেও, সাংহাইয়ের পিপলস পার্কের আয়োজন সবচেয়ে বেশি আলোচিত। এখানে বিপুল আগ্রহ নিয়ে বাবা-মায়েরা আসেন সন্তানের জন্য সম্ভাব্য জীবনসঙ্গী খুঁজতে।
চীনের দীর্ঘদিনের এক-সন্তান নীতির কারণে বহু পরিবারে সব স্বপ্ন, সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এখন একমাত্র সন্তানকে ঘিরেই আবর্তিত। একসময় আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিতজনের মাধ্যমে সম্পর্ক খোঁজার প্রচলন থাকলেও, নগরজীবনের ব্যস্ততা ও সামাজিক দূরত্বে সেই চিত্র বদলে গেছে। বিশাল শহরের মানুষ ক্রমেই আরও একাকী হয়ে পড়ছে, কমছে সামাজিক যোগাযোগ—আর সেই শূন্যতা থেকেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই ভিন্নধর্মী ‘ম্যারেজ মার্কেট’।

অন্যদিকে, নতুন প্রজন্মের অনেক চীনা তরুণ-তরুণী বিয়েতে দেরি করতে চান, কেউ কেউ আবার বিয়ের প্রতি আগ্রহই হারাচ্ছেন। তাদের কাছে সম্পর্ক মানে শুধু সামাজিক বন্ধন নয়; আবেগ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানসিক সামঞ্জস্যও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাবা-মায়েরা বেশি ভাবছেন নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও পারিবারিক ভবিষ্যৎ নিয়ে।
এই প্রজন্মগত পার্থক্যই ‘ম্যারেজ মার্কেট’কে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এখানে শুধু পাত্র-পাত্রীর সন্ধান হয় না, বরং মুখোমুখি দাঁড়ায় দুই প্রজন্মের ভিন্ন জীবনদর্শন।
সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, অনেক বাবা-মা নিজেরাও জানেন তাদের সন্তান হয়তো এসব প্রস্তাবে রাজি হবে না। তারপরও প্রতি সপ্তাহে তারা হাজির হন, যেন ভালো ভবিষ্যতের আশায় চেষ্টা থেমে না থাকে।

পশ্চিমা বিশ্বের কাছে চীনের এই ‘ম্যারেজ মার্কেট’ বেশ বিস্ময়কর। কারণ যেখানে পশ্চিমে সাধারণত প্রেম আগে, বাস্তবতা পরে—সেখানে চীনের এই বাজারে শুরুটাই হয় বাস্তবতা দিয়ে, আর ভালোবাসা আসে পরে।
তবে অনেকের মতে, এটি কেবল বিয়ের সঙ্গী খোঁজার জায়গা নয়; বরং আধুনিক নগরজীবনের অনিশ্চয়তার মধ্যে ঐতিহ্য ও বাস্তবতার সমন্বয়ে টেকসই ভালোবাসার এক নতুন অনুসন্ধান।
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
এসি//