একে একে কাটা হচ্ছিল ধর্ষকের অঙ্গ, দেখছিল ধর্ষিত ও মৃত শিশুটির স্বজনরা
রাজধানীর পল্লবীর বাতাস এখন ভারী হয়ে আছে দ্বিতীয় শ্রেণির ছোট্ট শিশু রামিসা আক্তারের শোকে। ফুটফুটে এই শিশুটিকে যেভাবে পাশবিক নির্যাতনের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা স্তব্ধ করে দিয়েছে পুরো সমাজকে। রামিসার এই করুণ পরিণতি আর অপরাধীর নির্মমতা দাগ কেটেছে কোটি মানুষের হৃদয়ে। বিচারের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে চারপাশ; সবাই এখন অপরাধীর এমন এক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখতে চান, যা দেখে শিউরে উঠবে আর কোনো নরপশু।
রামিসা হত্যাকাণ্ডের এই রেশ ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে ২০১৫ সালের একটি বহুল আলোচিত অস্ট্রেলিয়ান স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র—‘দ্য ডিজাপেয়ারেন্স অব উইলি বিংহাম’।
রামিসার হত্যাকারীর জন্য যখন সাধারণ মানুষ চরমতম শাস্তির দাবি তুলছেন, ঠিক তখনই নেটদুনিয়ায় রীতিমতো ঝড় তুলেছে পরিচালক ম্যাথু রিচার্ডের এই ১২ মিনিটের মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ও ক্রাইম ড্রামাটি। সিনেমাটিতে দেখানো হয়েছে এক ধর্ষক ও খুনির জন্য বিচারব্যবস্থার এমন এক ব্যতিক্রমী ও হাড়হিম করা শাস্তি, যা প্রথাগত আইনকেও হার মানায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দর্শকরা রামিসা হত্যার বর্বরতার সাথে সিনেমাটির প্রেক্ষাপট মেলাচ্ছেন। অনেকেই বলছেন, রামিসার মতো নিষ্পাপ শিশুদের যারা এভাবে কেড়ে নেয়, তাদের জন্য উইলি বিংহামের মতোই কোনো ভয়ঙ্কর ও দৃষ্টান্তমূলক পরিণতি হওয়া উচিত।

কী আছে ‘দ্য ডিজাপেয়ারেন্স অব উইলি বিংহাম’ চলচ্চিত্রে?
মাত্র ১২ মিনিটের এই সংক্ষিপ্ত অবয়বে পরিচালক অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন বিচারব্যবস্থা, প্রতিশোধের আগুন এবং মানবিকতার এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন।
ব্যতিক্রমী বিচার: এখানে অপরাধীকে শুধু কারাগারে বন্দি রাখা বা ফাঁসি দেওয়া হয় না, বরং তার শাস্তি নির্ধারিত হয় এক দীর্ঘমেয়াদী এবং অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে।
দর্শকদের ভাবনা: চলচ্চিত্রটি দেখার পর দর্শক শুধু অপরাধের ঘৃণ্য রূপই দেখেন না, বরং বাধ্য হন ন্যায়বিচার আর প্রতিশোধের ভেতরের সূক্ষ্ম দেয়ালটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে।
চলচ্চিত্রটির মূল কাহিনী আবর্তিত হয়েছে উইলি বিংহাম নামের এক অপরাধীকে কেন্দ্র করে, যে একটি নিষ্পাপ শিশু কন্যাকে ধর্ষণ ও নির্মমভাবে খুন করে। তবে সেই দেশ থেকে মৃত্যুদণ্ডের আইন তুলে নেওয়ায় আদালত তাকে সরাসরি ফাঁসি না দিয়ে ‘প্রগ্রেসিভ অ্যাম্পুটেশন’ বা পর্যায়ক্রমিক অঙ্গচ্ছেদ নামের এক নতুন ও নজিরবিহীন শাস্তি ঘোষণা করে।
এই শাস্তির নিয়ম অনুযায়ী, সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত সার্জারির মাধ্যমে ধাপে ধাপে অপরাধীর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ কেটে ফেলা হবে এবং ভুক্তভোগী পরিবার চাইলে এই শাস্তি আরও দীর্ঘায়িত করতে পারবে। শাস্তির খবর শুনে উইলি বিংহাম তাকে একবারে মেরে ফেলার আকুতি জানালেও আইনি কারণে তার সেই আবেদন খারিজ হয়ে যায়।
গল্পের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায়, প্রথম অস্ত্রোপচারে উইলির বাম হাত কেটে বাদ দেয়া হয়, যা অপারেশন থিয়েটারের কাচের ওপাশ থেকে দাঁড়িয়ে দেখে ভুক্তভোগী শিশুটির পরিবার। এরপর অবাধ্য ও বখাটে কিশোরদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে হুইলচেয়ারে করে এই পঙ্গু উইলিকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় সচেতনতামূলক বক্তৃতা দেয়ানো হয়। সময়ের ব্যবধানে একে একে কেটে ফেলা হয় তার ডান পা, একটি কিডনি ও ফুসফুসের অংশ। একপর্যায়ে উইলির কান্নাকাটি ও পঙ্গু শরীর দেখে ভুক্তভোগী পরিবারের অন্য সদস্যরা সহ্য করতে না পারলেও, প্রতিশোধের আগুনে পুড়তে থাকা শিশুটির বাবা প্রতিবারই নির্বিকার চিত্তে পরবর্তী অঙ্গচ্ছেদের অনুমতি পত্রে স্বাক্ষর করতে থাকেন।

পঞ্চম অস্ত্রোপচারের সময় যখন উইলির যৌনাঙ্গ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়, তখন সে কান্নায় ভেঙে পড়লেও কাচের ওপাশে থাকা বাবার চোখের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এই অপারেশনের পর উইলি মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে জ্যান্ত লাশে পরিণত হয়। পরবর্তী সার্জারিগুলোতে তার দুই কান, নাক এবং জিহ্বার অগ্রভাগ কেটে ফেলা হয়। তবে গল্পের শেষ দিকে এক চূড়ান্ত মনস্তাত্ত্বিক মোড় দেখা যায়।
গল্পের শেষ অঙ্কে এসে দর্শক মুখোমুখি হন এক চরম মনস্তাত্ত্বিক মোড়ের, যা শিউরে ওঠার পাশাপাশি স্তব্ধ করে দেয় মানবমনকে। চিকিৎসকদের সামনে সুযোগ ছিল অপরাধীর হার্ট কিংবা ব্রেন অপারেশন করে এই দীর্ঘ যন্ত্রণার চিরতরে অবসান ঘটানোর। কিন্তু ভুক্তভোগী সেই শিশুটির বাবা পরবর্তী অস্ত্রোপচারের ফাইলে স্বাক্ষর করতে সাফ অস্বীকৃতি জানান। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন, মৃত্যু মানেই তো সব কষ্ট থেকে মুক্তি। তাই উইলিকে মৃত্যুর কোলে অনায়াস মুক্তি না দিয়ে, তিনি বেছে নেন প্রতিশোধের এক চরমতম রূপ। অস্ত্রোপচার বন্ধের নির্দেশ দিয়ে উইলিকে ঠেলে দেয়া হয় এক জীবন্ত নরকে—যেখানে চোখ, কান, নাক আর জিহ্বা হারানো এক টুকরো মাংসপিণ্ড হয়ে, এক চরম যন্ত্রণাদায়ক পঙ্গুত্ব নিয়ে তাকে আজীবন বেঁচে থাকতে হবে।
১২ মিনিটের এই সংক্ষিপ্ত ক্যানভাসে উইলি বিংহামের চরিত্রে অভিনেতা কেভিন ডি-র অনবদ্য ও হাড়হিম করা অভিনয় সিনেমাটিকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। অপরাধের বিপরীতে শাস্তির মনস্তত্ত্ব নিয়ে তৈরি এই শক্তিশালী ও তীক্ষ্ণ বার্তার কারণেই ‘দ্য ডিজাপেয়ারেন্স অব উইলি বিংহাম’ মুক্তি পাওয়ার এক দশক পরেও আজ বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মাঝে সমানভাবে আলোচিত এবং প্রাসঙ্গিক।
এসি//