কে এই সোনম ওয়াংচুক, যার দাপটে চাপের মুখে মোদীর মসনদ?
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ‘নিট’-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে চলমান আন্দোলন দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ব্যানারে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়েছে। দাবি পূরণ না হওয়ায় আন্দোলনের পরিধিও ক্রমশ বাড়ছে।
এমন পরিস্থিতিতে আন্দোলন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন জলবায়ু আন্দোলনকর্মী ও সমাজসেবী সোনম ওয়াংচুক। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে না— এমন নিশ্চয়তা পেলে তিনি চলমান অনশন ভাঙতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন স্থগিত করার আহ্বান জানাতেও তিনি রাজি আছেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। বুধবার (২৩ জুলাই) হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন সোনম ওয়াংচুক।
কে এই সোনম ওয়াংচুক?
সোনম ওয়াংচুক লাদাখের একজন খ্যাতিমান উদ্ভাবক, প্রকৌশলী ও সমাজসেবী। ২০০৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত আমির খান অভিনীত আলোচিত চলচ্চিত্র থ্রি ইডিয়টস-এর প্রধান চরিত্র ‘ফুংসুখ ওয়াংডু’ তার জীবন ও কর্ম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মিত।

১৯৬৬ সালে লাদাখে জন্ম নেওয়া ওয়াংচুকের শৈশব কেটেছে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে। এলাকায় কোনো বিদ্যালয় না থাকায় নয় বছর বয়স পর্যন্ত তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি। এ সময় তার মা স্থানীয় ভাষায় তাকে প্রাথমিক শিক্ষা দেন।
১৯৭৫ সালে তার বাবা জম্মু ও কাশ্মীর সরকারের নির্বাচনে জয়ী হলে পরিবার শ্রীনগরে চলে যায়। সেখানে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়লেও পরে দিল্লির বিশেশ কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি।
পরবর্তীতে শ্রীনগরের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (তৎকালীন রিজিওনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ) থেকে ১৯৮৭ সালে যন্ত্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ফ্রান্সের গ্রেনোবলের ক্রাটেরে স্কুল অব আর্কিটেকচার থেকে মাটির স্থাপত্য বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।
শিক্ষা ও উদ্ভাবনে অবদান
১৯৮৮ সালে কয়েকজন সহপাঠীকে নিয়ে লাদাখের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘স্টুডেন্টস এডুকেশনাল অ্যান্ড কালচারাল মুভমেন্ট অব লাদাখ’ (এসইসিএমওএল) প্রতিষ্ঠা করেন ওয়াংচুক। পরে ১৯৯৪ সালে ‘অপারেশন নিউ হোপ’ কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার, স্থানীয় সমাজ এবং নাগরিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে লাদাখের বিদ্যালয়গুলোতে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়।
এসইসিএমওএলের ক্যাম্পাস সম্পূর্ণ সৌরশক্তিনির্ভর। সেখানে রান্না, আলো কিংবা তাপের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার নেই।
১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত লাদাখের একমাত্র মুদ্রিত সাময়িকী ‘লাদাগস মেলং’-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এছাড়া ‘লাদাখ ২০২৫’ নীতিপত্র প্রণয়নে শিক্ষা ও পর্যটন খাতের নীতিনির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

২০১৩ সালে তিনি ‘আইস স্টুপা’ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে শীতকালে বরফ আকারে পানি সংরক্ষণ করে বসন্তে তা ব্যবহার করা সম্ভব হয়, যা লাদাখে পানির সংকট নিরসনে কার্যকর সমাধান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
পরবর্তীতে তিনি ‘হিমালয়ান ইনস্টিটিউট অব অল্টারনেটিভস, লাদাখ’ (এইচআইএএল) প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি স্থানীয় পরিবারভিত্তিক কমিউনিটি পর্যটন উদ্যোগ ‘ফার্মস্টেস লাদাখ’ চালু করে বিকল্প অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথও তৈরি করেন।
অবাক করার মতো হলেও সত্য, ওয়াংচুকের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষায় ফেল করতে হবে।
উদ্ভাবক থেকে আন্দোলনের মুখ
প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক হিসেবে পরিচিত হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক ও রাজনৈতিক নানা ইস্যুতেও সক্রিয় হয়ে ওঠেন সোনম ওয়াংচুক। ২০১৯ সালে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর লাদাখের পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং ষষ্ঠ তফসিলের সাংবিধানিক সুরক্ষার দাবিতে আন্দোলনে নামেন তিনি।

একাধিক অনশন কর্মসূচির মাধ্যমে জলবায়ু সংকট, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে তিনি ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার রয়েছেন। আর এবার নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন এই লাদাখি সমাজকর্মী।
এসি//