আন্তর্জাতিক

অভিবাসী সংকট নিয়ে ইইউর কিছু দেশের অবস্থানকে ‘স্বার্থপর’ আখ্যা স্পেনের

মরক্কো থেকে স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতায় বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর প্রবেশকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কয়েকটি সদস্য দেশের প্রতিক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করেছে স্পেন। দেশটি এসব প্রতিক্রিয়াকে ‘স্বার্থপর, বিভাজনমূলক ও আইনবহির্ভূত’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

শনিবার (০১ আগস্ট) ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডার লেয়েনকে পাঠানো এক চিঠিতে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাসকা জানান, ৩০ জুলাই সেউতায় প্রবেশ করা প্রায় ৬০ হাজার অভিবাসীর প্রায় সবাই ইতোমধ্যে মরক্কোতে ফিরে গেছেন। তবে এ ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৬৭ জনে পৌঁছেছে।

অভিবাসী সংকটের জেরে ইতালি এক মাসের জন্য স্পেনের সঙ্গে শেনজেন চুক্তির সুবিধা স্থগিত করে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি পরিস্থিতিকে ‘বিস্ময়কর’ আখ্যা দিয়ে কঠোর অবস্থান নেন। ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক ইতালির পদক্ষেপকে সমর্থন জানায়। অন্যদিকে চেক প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই বাবিশ সাময়িকভাবে স্পেনের শেনজেন সদস্যপদ স্থগিতের আহ্বান জানান।

এর জবাবে সানচেজ বলেন, মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই স্পেন সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে এবং কোনো অভিবাসীকে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে দেয়নি। তার অভিযোগ, কিছু ইউরোপীয় সরকার সংহতি প্রকাশের পরিবর্তে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, ভুল তথ্য ও পূর্বধারণার ভিত্তিতে স্পেনের সমালোচনা করছে।

তিনি আরও বলেন, সেউতা শেনজেন অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই এ ধরনের প্রতিক্রিয়া শুধু ভিত্তিহীন নয়, ইউরোপীয় ঐক্যের জন্যও ক্ষতিকর।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইইউর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের জরুরি বৈঠক আহ্বানের দাবি জানিয়ে সানচেজ বলেন, ইউরোপের বহিঃসীমান্ত রক্ষা করা সব সদস্য রাষ্ট্রের যৌথ দায়িত্ব।

এদিকে ইইউর ২৭ সদস্য দেশের মধ্যে ২২টি দেশও পৃথক এক খোলা চিঠিতে জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছে। তারা স্পেন ও মরক্কোর সমন্বয়ে অভিবাসীদের দ্রুত ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে ইউরোপীয় সহায়তা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম জানিয়েছেন, তিনি স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে যুক্তরাজ্য প্রস্তুত রয়েছে।

স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে সেউতার পরিস্থিতি প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। অধিকাংশ অভিবাসী ফিরে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যও পুনরায় চালু হয়েছে। ভবিষ্যতে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সমুদ্রপথে ভাসমান প্রতিরোধব্যবস্থা স্থাপনের কাজও শুরু হয়েছে।

অন্যদিকে ফ্রান্স স্পেন সীমান্তে তল্লাশি জোরদার করেছে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে। পর্তুগালও সীমান্ত নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডার লেয়েন বলেন, সেউতার ঘটনাগুলো গ্রহণযোগ্য নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ম না মেনে কাউকে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে না বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।

জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্জ স্পেনের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে মরক্কোর প্রতি অবৈধ অভিবাসীদের দ্রুত ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান।

এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর স্পেনের অভিবাসন নীতিকে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘটনাটিকে ‘বিপর্যয়’ উল্লেখ করে বলেন, এটি যেন একটি দেশের ওপর ব্যাপক আক্রমণের মতো।

তবে স্পেন সরকার তাদের অবস্থানকে সঠিক বলে দাবি করেছে। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে সেউতা ও মেলিয়ায় অতিরিক্ত সেনা, পুলিশ, ড্রোন, নৌযান ও ডুবুরি মোতায়েন করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী সানচেজের দাবি, মানবপাচারকারী চক্র স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়ে দিয়ে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। তিনি ঘটনাটিকে স্পেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর আঘাত বলেও উল্লেখ করেন।

ইউরোপীয় কমিশনার ম্যাগনুস ব্রুনার জানিয়েছেন, সেউতা থেকে এখন পর্যন্ত কোনো অভিবাসী ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারেনি।

উল্লেখ্য, গেল জুনে স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, সেউতা বা মেলিয়ার উপকূলে আটক অভিবাসীদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে মরক্কোয় ফেরত পাঠানো যাবে না। এরপর থেকেই সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও অভিবাসন নীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।

সূত্র: বিবিসি

 

এমএ//

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন