আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আজ
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আজ রোববার (৩০ আগস্ট)। দিবসটি উপলক্ষে গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুম বা জোরপূর্বক অন্তর্ধান একটি গুরুতর মানবাধিকার সমস্যা। বিশেষ করে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ভিন্নমতের রাজনৈতিক কর্মীদের দমনে অনেক সময় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হয়। এতে নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান সম্পর্কে পরিবার কোনো তথ্য পায় না এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, তাদের স্মরণ এবং স্বজনদের প্রতি সংহতি জানাতে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছর ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়ে আসছে। দিবসটির প্রধান লক্ষ্য গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সচেতনতা তৈরি এবং এ ধরনের ঘটনার জন্য রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
গুম প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ইতিহাস আরও পুরোনো। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর গুম হওয়া সব ব্যক্তির সুরক্ষা এবং এই অপরাধের দায়মুক্তি বন্ধ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও ভুক্তভোগীদের সহায়তার লক্ষ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি আন্তর্জাতিক সনদ গ্রহণ করা হয়। পরে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ‘সব ব্যক্তিকে জোরপূর্বক অন্তর্ধান থেকে সুরক্ষার আন্তর্জাতিক সনদ’ কার্যকর হয়। এই সনদেই ৩০ আগস্টকে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশে ২০১১ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। তবে দেশে গুমের ঘটনা নিয়ে আলোচনা বিশেষভাবে তীব্র হয় গত দেড় দশকে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মী, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের গুমের অভিযোগ সামনে আসে। স্বজনদের অভিযোগ ছিল, অনেককে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর তাঁদের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
দীর্ঘ সময় ধরে গুমের অভিযোগে বিভিন্ন স্থানে গোপন বন্দিশালা পরিচালনার কথাও উঠে আসে। এসব বন্দিশালা জনপরিসরে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিতি পায়। পরে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর এসব কথিত গোপন বন্দিশালা থেকে কয়েকজনকে দীর্ঘ সময় পর মুক্ত করার ঘটনায় গুমের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
গুমের ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিশন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে এ বিষয়ে নানা তথ্য উঠে এসেছে। জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর গুমের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও আবেদন করা হয়েছে। গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যরাও অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশে সাত শতাধিক মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৫০ জনের বেশি মানুষের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এসব ঘটনার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো গুমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছে।
এদিকে গুম প্রতিরোধ ও ভুক্তভোগীদের অধিকার নিশ্চিত করতে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মন্ত্রিসভা বিলটির নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পরে বিলটি বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
প্রস্তাবিত আইনে গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুমের কারণে কারও মৃত্যু হলে, মরদেহ উদ্ধার হলে অথবা পাঁচ বছর পরও নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান না পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক নয়টি সনদের মধ্যে আটটিতে স্বাক্ষর করেছে। তবে দীর্ঘদিন জাতিসংঘের আহ্বান সত্ত্বেও আগের সরকার গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করেনি। পরে ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট বাংলাদেশ ওই সনদে স্বাক্ষর করে।
গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদটি ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। ৩২টি দেশের অনুস্বাক্ষরের পর ২০১০ সালে এটি কার্যকর হয়। গুম বন্ধের পাশাপাশি দায়মুক্তি রোধ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের অধিকার ও সহায়তা নিশ্চিত করাই এই সনদের মূল লক্ষ্য।
সূত্র: বাসস
এসি//