আন্তর্জাতিক

ছাত্র আন্দোলনের চাপে আরও এক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের পদত্যাগ

সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্ডার ভুসিচ ছবি: সংগৃহীত

এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন সরকারবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে পদত্যাগ করেছেন দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের বলকান অঞ্চলের দেশ সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্ডার ভুসিচ। সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ এবং ক্রমবর্ধমান জনঅসন্তোষের মধ্যে এই পদত্যাগের ফলে দেশটিতে আগাম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পথ তৈরি হয়েছে।

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, আগামী অক্টোবরেই সার্বিয়ায় আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এর এক মাসেরও বেশি সময় পর অনুষ্ঠিত হবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ফলে চলতি বছরেই দুই দফা ভোটের আয়োজন করতে হবে দেশটিতে।

প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়লেও রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছেন না ভুসিচ। আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনে তার দল সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির হয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী হওয়ার কথা রয়েছে তার।

পদত্যাগের পর রাজধানী বেলগ্রেডে প্রেসিডেন্ট ভবনের সামনে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন ভুসিচ।

সেখানে তিনি বলেন, প্রায় নয় বছর ক্ষমতায় থেকে তার সরকার সার্বিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।

এর আগে গত জুনেই প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন ভুসিচ। একই সঙ্গে আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনে নিজের দলের হয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।

সার্বিয়ার সংবিধান অনুযায়ী, তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই তার।

রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ভুসিচের সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়মকানুন উপেক্ষা ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালে নোভি সাদ রেলস্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনা সেই অসন্তোষকে বড় ধরনের গণবিক্ষোভে রূপ দেয়।

এরপর শিক্ষার্থী ও শিক্ষক ছাড়াও শ্রমিক, কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে যোগ দেন।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ওই দুর্ঘটনা ভুসিচের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির এক দশকের বেশি সময়ের শাসনামলে থাকা বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র সামনে এনেছে।

রেলস্টেশনটির সংস্কারকাজের সঙ্গে ভুসিচও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। সংস্কারের পর স্টেশনটিকে সার্বিয়ার উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।

আন্দোলনের চাপের মধ্যে ভুসিচ সরকারের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি পদত্যাগ করলেও বিক্ষোভ থামেনি। পুরো গ্রীষ্মজুড়ে আন্দোলন চলতে থাকে। পরে পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং বিক্ষোভ নতুন মাত্রা পায়।

বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভুসিচের বর্তমান মেয়াদ আগামী বছর শেষ হওয়ার কথা ছিল।

তবে সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট পদ শূন্য হওয়ার পর সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। ফলে চলতি বছর শেষ হওয়ার আগেই দুই দফা ভোটের মুখোমুখি হতে হবে সার্বিয়ার জনগণকে।

ভুসিচ জানিয়েছেন, আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনের এক মাসেরও বেশি সময় পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দীর্ঘদিনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতেই আগাম নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন নির্বাচনের দাবিও ছিল আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি।

এর আগে ভুসিচ জানিয়েছিলেন, সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির নেতা হিসেবে তিনি আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নেবেন। অর্থাৎ প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়ার পরও দেশের রাজনীতির কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সক্রিয় থাকার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন পার্লামেন্টের স্পিকার ও সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির সদস্য আনা ব্রনাবিচ।

সার্বিয়ার সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম আরটিএস জানিয়েছে, সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে ভুসিচ ৪৯ জনকে ক্ষমা করেছেন। তাদের মধ্যে ২৩ জন শিক্ষার্থী এবং তাঁর দলের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনও রয়েছেন। গত দেড় বছরে দেশ যে ‘ভয়াবহ পরিস্থিতির’ মধ্য দিয়ে গেছে, তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল।

এদিকে আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভুসিচের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে থাকছে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ‘স্টুডেন্টস উইন’। পাশাপাশি পশ্চিমাপন্থি বিরোধী দলগুলোর জোট ‘ইউরোপিয়ান সার্বিয়া’ও নির্বাচনে অংশ নেবে।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সার্বিয়ার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন আলেকসান্ডার ভুসিচ। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ২০১৭ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভুসিচ একদিকে সার্বিয়াকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য করার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছেন। অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি চীনা বিনিয়োগের জন্য দেশটির অর্থনীতিকে আরও উন্মুক্ত করেছেন।

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন