ধর্ম

১৭ রমজান: আজ ‘ঐতিহাসিক বদর দিবস’

ছবি: সংগৃহীত

হিজরি বর্ষের পবিত্র রমজান মাসের আজ ১৭তম দিন, যা ইসলামের ইতিহাসে ঐতিহাসিক বদর দিবস হিসেবে পরিচিত। সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ধারণকারী এবং মুসলিম উম্মাহর বিজয় ও গৌরবের প্রতীক হিসেবে এই দিনটি বিশেষভাবে স্মরণীয়।

প্রায় দেড় হাজার বছর আগে, হিজরি দ্বিতীয় সনের এই দিনে মদিনা থেকে প্রায় ৭০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত বদর প্রান্তরে ইসলামের ইতিহাসের প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা বিশ্ব ইতিহাসের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল।

এই যুদ্ধ শুধু সামরিক বিজয়ের ঘটনা নয়; এটি ছিল আল্লাহর ওপর দৃঢ় বিশ্বাস, ত্যাগ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবিচল থাকার এক অনন্য উদাহরণ।

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাদের অধিকাংশ ছিলেন প্রায় নিরস্ত্র এবং যুদ্ধের সরঞ্জামও ছিল অতি সীমিত। মুসলিম বাহিনীর সম্বল ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া ও ৭০টি উট; বিপরীতে কুরাইশদের ছিল ১০০ ঘোড়া, ৬০০ লৌহবর্ম ও আধুনিক সব রণসজ্জা।

তৎকালীন কুরাইশ নেতা আবু জাহেলের নেতৃত্বে প্রায় এক হাজার প্রশিক্ষিত ও সুসজ্জিত সৈন্যের এই বিশাল বাহিনী রণক্ষেত্রে উপস্থিত হয়েছিল। বাহ্যিক শক্তি ও সামরিক প্রস্তুতির মানদণ্ডে এই যুদ্ধ ছিল এক চরম অসম লড়াই। কিন্তু মানুষের পার্থিব হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে যে মহান আল্লাহর অশেষ কুদরত ও সাহায্য বিদ্যমান, বদরের প্রান্তর তারই এক অবিস্মরণীয় সাক্ষী হয়ে আছে।

যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে আল্লাহর রাসুল (সা.) গভীর আবেগ ও আকুতি নিয়ে মহান রবের দরবারে দোয়া করেছিলেন—‘হে আল্লাহ! আজ যদি এই ক্ষুদ্র দলটি ধ্বংস হয়ে যায়, তবে পৃথিবীতে তোমার ইবাদত করার মতো আর কেউ থাকবে না।’

আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় নবীর সেই দোয়া কবুল করেন এবং ইমানদীপ্ত ক্ষুদ্র দলটিকে বিজয় দান করেন। পবিত্র কোরআনের সুরা হজের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা ইতিপূর্বেই নির্যাতিত মুসলমানদের আত্মরক্ষার অনুমতি দিয়েছিলেন। সেই ঐশী নির্দেশনার আলোকেই বদরের ময়দানে রচিত হয় ন্যায় ও অন্যায়ের এক নতুন ইতিহাস, যা যুগ যুগ ধরে মুসলমানদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে। মানুষের কল্পনার অতীত ফলাফল বয়ে এনেছিল এই যুদ্ধ।

বদরের প্রান্তরে কুরাইশদের দম্ভ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে আল্লাহ তায়ালা প্রমাণ করেন যে, প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে ইমানের মধ্যে। যুদ্ধে কুরাইশদের ৭০ জন নিহত হয় এবং আরও ৭০ জন বন্দি হয়। অন্যদিকে, মুসলমানদের মধ্যে শহীদ হন মাত্র ১৪ জন সাহাবি। এই বিজয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, মহান আল্লাহ চাইলে স্বল্পসংখ্যক মানুষ দিয়েও যেকোনো বৃহৎ শক্তিকে পরাজিত করতে পারেন।

প্রতিবছর ১৭ রমজান বিশ্বব্যাপী মুসলিমরা অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও গৌরবের সঙ্গে বদরের ঐতিহাসিক বিজয় এবং শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করেন। বদরের দিন আমাদের শিক্ষা দেয় যে—সাফল্যের মাপকাঠি সংখ্যা বা সামরিক শক্তি নয়; প্রকৃত বিজয় আসে সত্যের পথে দৃঢ় থাকা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখার মাধ্যমে।

আজকের দিনে মুসলিম বিশ্বের শান্তি, সমৃদ্ধি এবং ঐক্যের জন্য বিশেষ দোয়া ও আলোচনা আয়োজন করা হয়। বদরের শিক্ষা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে, ইসলামের শান্তি, সাম্য ও সহমর্মিতার আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করে একটি সুন্দর ও মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলার নতুন প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করাই এই দিবসের প্রকৃত অর্থ ও তাৎপর্য।

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন