সোনুকে কাবু করা ‘পিঞ্চড নার্ভ’ হয়তো নিঃশব্দে বাসা বাঁধছে আপনার পিঠেও
মঞ্চের চেনা আলো-আঁধারি। গিটারের প্রথম সুরে শ্রোতারা মেতে ওঠার আগেই এক তীব্র যন্ত্রণার স্রোত পিঠ বেয়ে নেমে গেল পায়ের পাতা পর্যন্ত। চিবুকটা সামান্য উঁচিয়ে যেই না গাইতে যাবেন, মনে হলো ঘাড়ের ভেতর কে যেন একঝাঁক পিন ফুটিয়ে দিল! ঠিক এই রকম এক অসহ্য শারীরিক কষ্টের মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন বলিউডের মেলোডি কিং সোনু নিগম।
সম্প্রতি একটি ভিডিও বার্তায় এই জনপ্রিয় গায়ক নিজেই জানিয়েছেন তার অসুস্থতার কথা। তিনি আক্রান্ত হয়েছেন ‘পিঞ্চড নার্ভ’ বা সংকুচিত স্নায়ুর সমস্যায়। রোগটি এতটাই যন্ত্রণাদায়ক যে, গত কয়েক দিনে তাকে বেশ কয়েকবার এমআরআই এবং সিটি স্ক্যান করাতে হয়েছে। চলছে কড়া ওষুধ আর নিয়মিত ফিজিয়োথেরাপি। তবে এই চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়াটিও ভীষণ কষ্টদায়ক বলে জানিয়েছেন তিনি।
সোনু নিগমের এই অসুস্থতা চেনা ছন্দের বাইরে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক, আসলে কী এই রোগ এবং এর থেকে বাঁচার উপায়।
‘পিঞ্চড নার্ভ’ আসলে কী?
আমাদের শরীরে মস্তিষ্কের বার্তা বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কোটি কোটি স্নায়ু বা নার্ভ ছড়িয়ে রয়েছে, যা দেখতে অনেকটা বৈদ্যুতিক তারের মতো। এই স্নায়ুগুলো সাধারণত স্বাধীনভাবে নিজের কাজ করতে পছন্দ করে। কিন্তু কোনো কারণে যদি এদের ওপর আশেপাশের হাড়, পেশি, টেন্ডন কিংবা মেরুদণ্ডের স্থানচ্যুত নরম ডিস্ক এসে চেপে বসে, তখন স্নায়ুটির স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই দমবন্ধকর পরিস্থিতিকেই বলা হয় নার্ভ কম্প্রেশন বা পিঞ্চড নার্ভ।
শরীর যে অদ্ভুত সংকেতগুলো পাঠায়
দেহের কোনো অংশে স্নায়ু চেপে গেছে কি না, তা বোঝার জন্য শরীর কিছু আগাম লক্ষণ দেখায়। এগুলো অবহেলা করলেই বিপদ:
সুই ফোটার মতো অনুভূতি: হঠাৎ মনে হতে পারে শরীরের নির্দিষ্ট কোনো অংশে কেউ অজস্র সুচ ফোটাচ্ছে।
অসাড়তা: ঘুম থেকে ওঠার পর হঠাৎ যদি হাত বা পায়ের পাতায় কোনো অনুভূতি না পাওয়া যায়, এমনকি কিছু ফুটলেও যদি টের পাওয়া না যায়, তবে সতর্ক হতে হবে।
বিদ্যুৎ চমকের মতো ব্যথা: ঘাড় থেকে শুরু হওয়া তীব্র ব্যথা যদি চাবুকের মতো হাত পর্যন্ত নেমে আসে, কিংবা কোমর থেকে সেই যন্ত্রণার স্রোত পায়ের আঙুল ছুঁয়ে যায়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
কেন দানা বাঁধে এই রোগ?
আধুনিক জীবনযাত্রা এবং কিছু শারীরিক পরিবর্তন এই সমস্যার জন্য দায়ী:
মেরুদণ্ডের ডিস্কের সমস্যা:
মেরুদণ্ডের হাড়গুলোর মাঝে কুশনের মতো এক ধরনের নরম ডিস্ক থাকে। কোনো কারণে এই ডিস্কটি নিজের জায়গা থেকে সরে গেলে বা ফেটে বাইরে বেরিয়ে এলে তা মূল স্নায়ুর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে।
বসার ভুল অভ্যাস:
ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটারের সামনে কুঁজো হয়ে বসে কাজ করা বা ভুল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে মেরুদণ্ডে বাড়তি চাপ পড়ে, যা ঘাড় ও কোমরের স্নায়ুকে সংকুচিত করে তোলে।
হাড়ের ক্ষয় ও বাতের সমস্যা:
বয়সের সাথে সাথে হাড়ের ক্ষয় হলে মেরুদণ্ডে ছোট ছোট অতিরিক্ত হাড় বা ‘কাঁটা’ গজিয়ে ওঠে। এগুলো স্নায়ু চলাচলের পথকে সরু করে দেয়।
অতিরিক্ত ওজন:
শরীরের বাড়তি ওজন মেরুদণ্ডের ওপর চাপ বাড়িয়ে ডিস্কগুলোকে চ্যাপ্টা করে ফেলে, ফলে চারপাশের স্নায়ুগুলো সহজে চেপে যায়।
আকস্মিক আঘাত:
সড়ক দুর্ঘটনা, হঠাৎ পড়ে যাওয়া কিংবা খেলাধুলার সময় পিঠে বা ঘাড়ে চোট লাগলে তাৎক্ষণিকভাবে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
মুক্তি পাওয়ার উপায়
সাধারণত সঠিক যত্ন নিলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই সমস্যা কেটে যায়। এর ঘরোয়া ও চিকিৎসাগত প্রতিকারগুলো হলো:
পূর্ণ বিশ্রাম: যে ধরনের নড়াচড়া বা কাজে ব্যথা বাড়ে, সেগুলো কিছুদিনের জন্য পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হবে।
ব্যথানাশক প্যাচ: ওষুধের ওপর নির্ভরতা কমাতে সোনু নিগমের মতো আক্রান্ত স্থানে ব্যথানাশক প্যাচ ব্যবহার করা যেতে পারে।
ফিজিয়োথেরাপি: বিশেষজ্ঞ থেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট কিছু ব্যায়াম বা স্ট্রেচিং করলে মেরুদণ্ডের চারপাশের পেশি শক্তিশালী ও নমনীয় হয়।
ঠান্ডা ও গরম সেঁক: তীব্র ব্যথা কমাতে শুরুতে বরফ বা ঠান্ডা সেঁক এবং পরবর্তীতে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করতে গরম সেঁক দেওয়া বেশ কার্যকর।
ওষুধ ও অস্ত্রোপচার: চিকিৎসকের পরামর্শে প্রদাহ ও স্নায়ুর ব্যথা কমানোর ওষুধ খেতে হবে। যদি সব ধরনের থেরাপি ব্যর্থ হয় এবং স্নায়ুর স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকি থাকে, তবেই চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন।
সতর্কবার্তা-
যদি হাত বা পায়ের পেশি খুব দ্রুত অবশ হতে শুরু করে এবং হাত-পা নাড়ানোর ক্ষমতা চলে যায়, তবে এক মুহূর্তও দেরি না করে অবিলম্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
এসি//