২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে হৃদয়ছোঁয়া মুহূর্তগুলো
স্পেনের শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। তবে এই আসর শুধু ফুটবল কিংবা ট্রফির লড়াইয়েই সীমাবদ্ধ ছিল না। ছয় সপ্তাহজুড়ে কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত এই টুর্নামেন্টে যেমন ছিল রোমাঞ্চকর ম্যাচ, তেমনি ছিল বিতর্ক, আবেগ আর মানবিকতার অসংখ্য মুহূর্ত।
ভিসা জটিলতা, আকাশছোঁয়া টিকিটের দাম, রেফারিদের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফোনকল, বাধ্যতামূলক পানিবিরতি, বৈরী আবহাওয়া এবং কিছু সমর্থকের আচরণ—সব মিলিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনায় ছিল এবারের বিশ্বকাপ।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে কয়েকটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর সেসব মুহূর্তই এখন সবচেয়ে বেশি মনে রাখার মতো।
মায়ের সঙ্গে ভোজনিয়ার আবেগঘন পুনর্মিলন
কাবো ভার্দের গোলরক্ষক ভোজনিয়া বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত নাম হয়ে ওঠেন। ৪০ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক স্পেনের বিপক্ষে একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে সবাইকে মুগ্ধ করেন। পরবর্তীতে তিনি শুধু ফুটবলপ্রেমীদের কাছেই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান।
তবে মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়েও বেশি আবেগ ছড়ায় তার মায়ের সঙ্গে পুনর্মিলনের গল্প।

ভোজনিয়া, যার প্রকৃত নাম জোসিমার দিয়াস, জানিয়েছিলেন ভিসার জামানতের অর্থ জোগাড় করতে না পারায় তার মা যুক্তরাষ্ট্রে এসে বিশ্বকাপ দেখতে পারেননি। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সাড়া পড়ে। পরে মার্কিন কর্তৃপক্ষ তার মায়ের ভ্রমণ-সংক্রান্ত খরচ মওকুফ করে এবং ফ্লোরিডার মায়ামিতে কাবো ভার্দের পরের ম্যাচে উপস্থিত থাকার ব্যবস্থা করে দেয়।
বিশ্বকাপ অভিষেকের আগে ভোজনিয়ার মা বলেছিলেন, তার ছেলে স্পেনকে গোল করতে দেবে না। শেষ পর্যন্ত সেই ভবিষ্যদ্বাণীই সত্যি হয়েছিল।
লামিন ইয়ামালের ছোট ভাইই অনুষ্ঠানের আসল তারকা
স্পেনের তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল বিশ্বকাপ জিতেছেন। কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে আলো কেড়ে নেয় তার তিন বছর বয়সী ছোট ভাই কেইনে।
প্রতিটি ম্যাচ শেষে বড় ভাইয়ের কাছে ছুটে যাওয়া, মাঠে দৌড়ে বেড়ানো আর নিষ্পাপ উদ্যাপনের দৃশ্য বারবার বড় পর্দায় ভেসে ওঠে। মুহূর্তগুলো দ্রুতই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
মাত্র তিন বছর বয়সেই কেইনে হয়ে ওঠে বিশ্বকাপের সবচেয়ে আদরের মুখগুলোর একটি।

উজবেকিস্তানের কাঁদতে থাকা শিশুকে জড়িয়ে ধরেছিল কলম্বিয়া
কলম্বিয়ার বিপক্ষে ৩-১ গোলে হারের পর উজবেকিস্তানের এক শিশুসমর্থকের কান্নার দৃশ্য মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। হাতে থাকা বিশ্বকাপের প্রতিরূপ ট্রফি জড়িয়ে ধরে সে অঝোরে কাঁদছিল। চারপাশের কলম্বিয়ান সমর্থকেরা তখন বিদ্রুপ না করে উল্টো ‘উজবেকিস্তান, উজবেকিস্তান’ ধ্বনি দিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেন। ভিডিওটি নজরে আসে উজবেকিস্তান দলের। পরে ইসফানদিয়ার বেগমাতভ নামের সেই শিশুকে দলের অনুশীলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

খেলোয়াড়দের সঙ্গে দেখা করার পাশাপাশি উপহার হিসেবে সে পায় স্বাক্ষর করা জার্সি, একটি নেকড়ে পুতুল এবং অনেক ভালোবাসা।
পোষা হাঁস থেকে বিশ্বকাপের অঘোষিত মাসকট
মার্লিন নামের একটি পোষা হাঁসও এবারের বিশ্বকাপে হয়ে ওঠে অন্যতম আকর্ষণ। মেক্সিকোর জার্সি গায়ে স্টেডিয়ামের আশপাশে ঘুরে বেড়ানো এই হাঁসের ছবি ও ভিডিও দ্রুতই ভাইরাল হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই মার্লিনকে বিশ্বকাপের অঘোষিত মাসকট হিসেবে দেখা শুরু করেন সমর্থকেরা।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউমও মার্লিনের সঙ্গে দেখা করেন। হাঁসটির মালিক কার্লা গোমেজ জানান, বাড়তে থাকা খরচ সামলাতে তিনি মার্লিনের নামে ট্রেডমার্ক করতে চান। এ বিষয়ে সহায়তার আশ্বাসও দেন প্রেসিডেন্ট।

স্টেডিয়ামজুড়ে দেখা যায় মার্লিনের পুতুল। এমনকি শেষ ষোলোতে ইংল্যান্ডের কাছে ৩-২ গোলে হারের পর এক মেক্সিকান সমর্থক নিজের মার্লিন পুতুলটি উপহার দেন এক ইংলিশ শিশুকে। ফুটবলের সৌন্দর্য যেন ধরা পড়ে সেই ছোট্ট মুহূর্তেই।
বড়দিনের সোয়েটার পরে বিশ্বকাপ, পরে পেল প্রিয় জার্সি
মেক্সিকোর প্রথম ম্যাচ উপলক্ষে স্কুলে জাতীয় দলের সমর্থনে পোশাক পরে যেতে বলা হয়েছিল ছোট্ট সান্তিকে। জার্সি না থাকায় সে সবুজ, সাদা ও লাল রঙের একটি বড়দিনের সোয়েটার পরে স্কুলে যায়। নিজের দেশের প্রতি তার ভালোবাসার সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।

পরে মেক্সিকো ফরোয়ার্ড সান্তিয়াগো হিমেনেস তার জন্য নিজের নাম লেখা একটি জার্সি পাঠান এবং একটি বিশেষ শুভেচ্ছাবার্তাও দেন।
বেলিংহামের জন্য গ্যালারি জুড়ে ‘হে জুড’
ইংল্যান্ডের প্রতিটি ম্যাচ শেষে গ্যালারিজুড়ে বেজে উঠত বিটলসের বিখ্যাত গান হে জুড। সেটি ছিল দলের তারকা জুড বেলিংহামের প্রতি সমর্থকদের ভালোবাসার প্রকাশ। ২৩ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার সাত গোল করে টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন এবং দলকে তৃতীয় স্থান এনে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

গোল্ডেন বুটজয়ী কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসির পর তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবেও বিশ্বকাপ শেষ করেন তিনি।
অভিষেকের আগে কেঁদে ফেলেছিলেন কুরাসাও কোচ
জার্মানির বিপক্ষে কুরাসাওয়ের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ শুরুর আগে জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় চোখের পানি লুকাতে পারেননি দলের কোচ ডিক অ্যাডভোকাট। ম্যাচে ৭-১ গোলে হারলেও সেটি ছিল কুরাসাওয়ের জন্য গর্বের দিন। ইতিহাসে সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে খেলার কৃতিত্ব গড়ে তারা।

একই সঙ্গে লিভানো কোমেনেনসিয়া করেন কুরাসাওয়ের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ গোল। ৭৮ বছর বয়সী অ্যাডভোকাট বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে প্রবীণ কোচ। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর কুরাসাওয়ের বিশ্বমঞ্চে উঠে আসার পুরো যাত্রার সাক্ষী ছিলেন তিনি।
তার ভাষায়, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবেগ আরও সহজে প্রকাশ পায়। দল কতটা পথ এগিয়েছে, সেটি নিজের চোখে দেখতে পারা সত্যিই অসাধারণ এক অনুভূতি।
এসি//