কত ঘণ্টা ঘুমান বিশ্বনেতারা?
দেশ পরিচালনা কখনোই সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ কোনো চাকরি নয়। রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের দিন-রাত কাটে বৈঠক, জরুরি পরিস্থিতি, ব্রিফিং, ভাষণ এবং দেশ-বিদেশের নানা কর্মসূচিতে। কখনো গভীর রাতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা, আবার কখনো ভোরে শুরু হয় ব্যস্ততা। এত কিছুর মধ্যে ঘুমের জন্য সময়টুকু বের করা তাদের জন্য কতটা সম্ভব?
সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির ঘুমের অভ্যাস নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত জুলাইয়ে এক সরকারি ছুটির দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানান, শেষ পর্যন্ত টানা পাঁচ ঘণ্টা ঘুমাতে পেরেছেন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর এমন দীর্ঘ ঘুম তার কাছে বিরল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার দাবি অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেক রাতে তার ঘুম নেমে এসেছে শূন্য থেকে তিন ঘণ্টায়।
তাকাইচির এই মন্তব্য জাপানে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও অতিরিক্ত কাজের চাপ দেশটির দীর্ঘদিনের বড় সমস্যা। অতিরিক্ত কাজের কারণে মৃত্যুর জন্য জাপানে ‘কারোশি’ শব্দটি বহুল ব্যবহৃত।
তবে প্রশ্ন উঠছে, কম ঘুম কি সত্যিই একজন নেতার কঠোর পরিশ্রম ও দায়িত্বশীলতার প্রমাণ? নাকি পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তৈরি করতে পারে ঝুঁকি?
বিভিন্ন সময় নিজেদের ঘুমের অভ্যাস সম্পর্কে বিশ্বনেতারা যে তথ্য দিয়েছেন এবং প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যাক, তারা সাধারণত কত ঘণ্টা ঘুমান।
সানায়ে তাকাইচি: শূন্য থেকে ৩ ঘণ্টা
কম ঘুমানো বিশ্বনেতাদের তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর রাতে সাধারণত শূন্য থেকে তিন ঘণ্টা ঘুমান বলে জানিয়েছেন তিনি।
কোনো ছুটির দিনে টানা পাঁচ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পাওয়াকেও তিনি বিশেষ সৌভাগ্য হিসেবে দেখেন। তার এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর জাপানে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও অতিরিক্ত কাজের সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প: ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে কম ঘুমানো মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছেন। ২০১৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, সাধারণত রাতে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ঘুমান।
প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রায়ই রাত ১২টা বা ১টা পর্যন্ত কাজ করেন এবং ভোর ৫টার মধ্যেই জেগে ওঠেন। তুলনামূলক কম ঘুমিয়েও কাজ চালিয়ে যেতে পারেন—এমন ধারণাই তিনি বিভিন্ন সময় প্রকাশ করেছেন।
নরেন্দ্র মোদী: ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও জানিয়েছেন, তার ঘুমের সময় সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসকদের পরামর্শ দেওয়া সময়ের তুলনায় অনেক কম।
২০১৯ সালে অভিনেতা অক্ষয় কুমারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মোদী নিজের ঘুমের অভ্যাসের কথা জানান। তিনি বলেন, তার শরীরের জৈবিক ছন্দ এমনভাবে তৈরি হয়ে গেছে যে রাতে তিন থেকে চার ঘণ্টা ঘুমই তার জন্য যথেষ্ট। তবে এই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি গভীর ঘুমাতে পারেন বলে উল্লেখ করেন।
ইমানুয়েল মাক্রোঁ: ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁর ব্যস্ত কর্মসূচি নিয়েও বিভিন্ন সময় আলোচনা হয়েছে। ২০১৮ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যস্ততার মধ্যে অনেক রাতে তার ঘুমের সময় তিন থেকে চার ঘণ্টায় নেমে আসত।
গভীর রাত পর্যন্ত সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা ও সরকারি কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভ্যাস ছিল তার।
বারাক ওবামা: প্রায় ৫ ঘণ্টা
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও ছিলেন রাত জেগে কাজ করা নেতাদের একজন। ২০১৬ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাধারণত রাতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ঘুমাতেন তিনি।
পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার শেষ করার পর বেশ কয়েক ঘণ্টা একা কাজ করতেন ওবামা। সরকারি নথি দেখা, বিভিন্ন ব্রিফিং পড়া, লেখালেখি এবং পরদিনের প্রস্তুতি—এসব কাজের জন্য গভীর রাতের নিরিবিলি সময়কে কাজে লাগাতেন তিনি।
আঙ্গেলা মেরকেল: ব্যস্ত সময়ে কয়েক ঘণ্টা
জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মেরকেলও কাজের চাপের সময় ঘুমের ঘাটতি সামলানোর কথা জানিয়েছিলেন। নিজের এই সক্ষমতাকে তিনি উটের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
মেরকেল বলেছিলেন, কাজের চাপ বেশি থাকলে টানা কয়েক দিন মাত্র কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়েও কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। তবে পরে সুযোগ পেলে সেই ঘুমের ঘাটতি পূরণ করতে হয়।
অর্থাৎ স্থায়ীভাবে কম ঘুমানোর কথা বলেননি তিনি। বরং সাময়িকভাবে ঘুমের ঘাটতি সামলে পরে তা পূরণ করার বিষয়টিই তুলে ধরেছিলেন।
মার্গারেট থ্যাচার: প্রায় ৪ ঘণ্টা
বর্তমানের মতো স্মার্টফোন, চব্বিশ ঘণ্টার সংবাদমাধ্যম কিংবা সার্বক্ষণিক যোগাযোগের যুগ আসার অনেক আগেই কম ঘুমিয়ে কাজ করার জন্য পরিচিত ছিলেন ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার।
‘আয়রন লেডি’ নামে পরিচিত এই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছিলেন, রাতে প্রায় চার ঘণ্টা ঘুমাতেন তিনি। ১৯৮৯ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে থ্যাচার বলেন, তার পক্ষে চার ঘণ্টার বেশি ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়েছিল।
তার সাবেক প্রেস সচিব স্যার বার্নার্ড ইনঘামও পরে জানান, থ্যাচার সাধারণত রাতে প্রায় চার ঘণ্টা ঘুমাতেন।
কম ঘুম কি সত্যিই বাড়ায় কর্মক্ষমতা?
রাজনীতিতে কম ঘুমিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করাকে অনেক সময় কঠোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও অসাধারণ কর্মক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি এতটা সরল নয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, খুব অল্পসংখ্যক মানুষের ক্ষেত্রে জিনগত বৈশিষ্ট্যের কারণে স্বাভাবিকভাবেই কম ঘুমের প্রয়োজন হতে পারে। তারা অল্প সময় ঘুমিয়েও স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারেন। তবে এমন মানুষ অত্যন্ত বিরল।
সাধারণ পূর্ণবয়স্ক মানুষের জন্য নিয়মিত কম ঘুমানো কোনো সুবিধা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের রাতে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেয়। পর্যাপ্ত ঘুম মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।
তাই রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একজন নেতা কত কম সময় ঘুমিয়ে কত বেশি সময় কাজ করছেন, সেটিই মূল বিষয় নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো—ঘুমের ঘাটতির মধ্যেও কোটি মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তার চিন্তাশক্তি কতটা স্বচ্ছ, মনোযোগ কতটা স্থির এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা কতটা অটুট থাকছে।
এসি//