যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়া মানেই মিশনের শেষ নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে সেটাই পাইলটের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক অধ্যায়ের শুরু।
ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার খবর সামনে আসার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আবারও আলোচনায় এসেছে পাইলটদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের বাস্তবতা। শত্রু অঞ্চলে বিমান বিধ্বস্ত হলে পাইলটকে শুধু আঘাত থেকে বাঁচা নয়, বরং ধরা পড়া এড়ানো এবং দীর্ঘ সময় টিকে থাকার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পরের পরিস্থিতিই পাইলটদের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্কের জায়গা। কারণ, ওই মুহূর্ত থেকে শুরু হয় একাকী টিকে থাকার যুদ্ধ, যেখানে শত্রুপক্ষের নজর এড়িয়ে নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, এমন পরিস্থিতির জন্য সামরিক পাইলটদের আগেই বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কীভাবে শত্রু এলাকায় বেঁচে থাকা যায়, কীভাবে উদ্ধার বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যায় এবং কীভাবে ধরা পড়ার ঝুঁকি কমানো যায়—এসবই তাদের প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পাইলটদের কাছে যা থাকে

আধুনিক বিমানবাহিনীতে পাইলটদের জন্য তৈরি করা হয় একটি বহুস্তরীয় আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা, যা সাধারণত ইজেকশন সিট, সারভাইভাল ভেস্ট ও ব্যক্তিগত সরঞ্জামের সমন্বয়ে গঠিত। আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা রিপোর্ট অনুযায়ী, এই কিটে সাধারণত থাকে জরুরি খাবার, পানি ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, স্যাটেলাইট রেডিও ও যোগাযোগ যন্ত্র, জিপিএস বীকন, কম্পাস ও সিগন্যালিং ডিভাইস (ফ্লেয়ার, স্ট্রোব লাইট), প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম (ব্যান্ডেজ, টুর্নিকেট), তাপরোধী কম্বল, রেইন পঞ্চো ও আগুন জ্বালানোর সরঞ্জাম এবং কিছু ক্ষেত্রে আত্মরক্ষার জন্য পিস্তল।
এই কিটটি ইজেকশনের সময় প্যারাশুটের সঙ্গে নেমে আসে এবং মাটিতে নামার পর সেটিই হয়ে ওঠে পাইলটের ‘লাইফলাইন’।
ইজেকশনের পর প্রথম কাজ: লুকানো
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাইলট মাটিতে নামার পর প্রথম কাজই হলো নিজেকে আড়ালে রাখা। একজন সাবেক মার্কিন পাইলটের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘প্রথম অগ্রাধিকার হলো লুকানো, কারণ ধরা পড়া এড়াতে হবে।’
এ কারণে পাইলটরা সাধারণত দ্রুত অবতরণস্থল ত্যাগ করেন, আশপাশের পরিবেশে আড়াল খোঁজেন এবং সরাসরি খোলা জায়গা বা জনবসতি এড়িয়ে চলেন।
যেভাবে ধরা পড়া এড়ান
আন্তর্জাতিক সামরিক নীতিমালা অনুযায়ী, পাইলটদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এসইআরই (সারভাইভাল, ইভেশন, রেজিস্ট্যান্স, এস্কেপ) পদ্ধতিতে।
এই প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে তারা দিনে লুকিয়ে রাতে চলাচল করেন, সীমিতভাবে রেডিও ব্যবহার করেন যাতে অবস্থান ফাঁস না হয়, তাপ শনাক্তকারী (থার্মাল ডিটেকশন) এড়াতে আশ্রয় নির্বাচন করেন এবং নিরাপদ উদ্ধারস্থলের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হন।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে ভূপাতিত এক মার্কিন পাইলট ‘নিম্নভূমিতে অবস্থান নিয়ে লুকিয়ে থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন’, যা এসইআরই কৌশলেরই অংশ।
বেঁচে থাকার লড়াই: পানি, আঘাত ও সময়
ইজেকশনের সময় পাইলটের আহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই মাটিতে নামার পর প্রথমেই তিনি নিজের শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন করেন। এরপর শুরু হয় বেঁচে থাকার লড়াই, সীমিত খাবার ও পানি ব্যবহার, আঘাত নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ অনুযায়ী আশ্রয় তৈরি।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একটি সারভাইভাল কিট সাধারণত ৩ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত টিকে থাকার মতো সরঞ্জাম দেয়।

উদ্ধারই শেষ লক্ষ্য
পাইলটদের মূল লক্ষ্য থাকে উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা। এজন্য তারা ব্যবহার করেন রেডিও সিগন্যাল, জিপিএস বীকন ও ফ্লেয়ার বা আলো সংকেত। একইসঙ্গে সামরিক বাহিনী দ্রুত কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ (সিএসএআর) অভিযান শুরু করে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হলেও ‘কোনো সদস্যকে ফেলে না আসা’ নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়।
কেন ধরা পড়া বড় ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শত্রুপক্ষের হাতে পাইলটের ধরা পড়া শুধু মানবিক নয়, কৌশলগত ঝুঁকিও তৈরি করে।
আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বন্দী পাইলটকে গোয়েন্দা তথ্যের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে, প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং সংবেদনশীল সামরিক প্রযুক্তি ফাঁসের ঝুঁকি তৈরি হয়।
সব মিলিয়ে যুদ্ধবিমানের পাইলটদের জন্য যুদ্ধ শুধু আকাশেই সীমাবদ্ধ নয়। ভূপাতিত হওয়ার পর শত্রুপক্ষের এলাকায় টিকে থাকা, ধরা পড়া এড়ানো এবং উদ্ধার হওয়া, এই পুরো প্রক্রিয়াই আরেকটি কঠিন মিশন।
সাম্প্রতিক সংঘাত দেখাচ্ছে, আকাশযুদ্ধ যতই আধুনিক হোক না কেন, ভূপাতিত হওয়ার পর পাইলটের বেঁচে থাকা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক যুদ্ধ, যেখানে প্রযুক্তির চেয়ে বেশি নির্ভর করে প্রশিক্ষণ, ধৈর্য এবং পরিস্থিতি সামলানোর মানসিকতার ওপর।
এসি//