আন্তর্জাতিক

‘আমি ফেঁসে গেছি, তুই ফাঁসিস না’—মৃত্যুর আগে তরুণীর রহস্যময় বার্তা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ছবি: সংগৃহীত

বিয়ের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই যেন ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছিল এক তরুণীর স্বপ্ন, আত্মবিশ্বাস আর বেঁচে থাকার ইচ্ছা। ভারতের ভোপালে রহস্যজনক মৃত্যু হওয়া ৩৩ বছর বয়সী টুইশা শর্মার শেষ সময়ের কিছু চ্যাট ও বার্তা এখন সামনে এনে দিচ্ছে তার নীরব মানসিক যন্ত্রণা, গভীর বিষণ্ণতা এবং শ্বশুরবাড়ির জীবনে নিজেকে ‘ফেঁসে যাওয়া’ এক নারীর অসহায় বাস্তবতা।

গত ১২ মে মধ্যপ্রদেশের ভোপালের কাটারা হিলস এলাকায় স্বামী সমর্থ সিংহের বাড়ি থেকে উত্তরপ্রদেশের নয়ডার বাসিন্দা টুইশা শর্মার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মৃত্যু ঘিরে রহস্যের পরত এখন আরও ঘনীভূত হয়েছে, বিশেষ করে মৃত্যুর আগের কিছু ব্যক্তিগত বার্তা প্রকাশ্যে আসার পর।

টুইশা ছিলেন একজন এমবিএ ডিগ্রিধারী, যিনি বিয়ের আগে দিল্লির একটি করপোরেট প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন। পেশাগত জীবনে সফল এই তরুণীর ব্যক্তিগত জীবনে কী এমন ঘটেছিল, যা তাকে চরম মানসিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিল—সেই প্রশ্নই এখন সামনে।

মৃত্যুর মাত্র পাঁচ দিন আগে, ৭ মে এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনে টুইশা লিখেছিলেন, ‘আমি প্রচণ্ড উদ্বেগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি কারণ আমি সারাদিন ঘরে বসে থাকি। আমি জীবনে নিজের মতো কিছু করতে চাই। বিয়ে হয়তো একটা পরিবার দেয়, কিন্তু তুমি যেখানেই থাকো না কেন, নিজের জন্য কাজ করা বন্ধ করতে পারো না।’

ওই চ্যাটে বান্ধবীকে তড়িঘড়ি বিয়ে না করার পরামর্শ দিয়ে টুইশা হিন্দি ভাষায় সতর্ক করে বলেন, ‘বিয়ের ভূত মাথায় চাপিয়ে হুট করে বিয়ে করিস না। খুব ভেবেচিন্তে পা বাড়াস। আপাতত শুধু এটুকুই বলব।’ বান্ধবী চিন্তিত হয়ে খোঁজ নিলে টুইশা জবাবে লিখেছিলেন, ‘আমি ঠিক আছি। আমার শুধু বাড়ির কথা খুব মনে পড়ে, তোর কথা মনে পড়ে।’

পরবর্তীতে ইনস্টাগ্রামের আরেকটি চ্যাটে টুইশার বার্তা ছিল আরও বেশি ভয়াবহ ও আতঙ্কগ্রস্ত। সেখানে তিনি অত্যন্ত অসহায়ত্ব প্রকাশ করে লিখেছিলেন, ‘আমি পুরোপুরি ফেঁসে গেছি ভাই। তুই শুধু ফাঁসিস না। এখন বেশি কথা বলতে পারব না, সময় সুযোগ বুঝে তোকে নিজেই ফোন করব।’ 

এই চ্যাটগুলো প্রকাশ্যে আসার পর ঘটনাটি আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, তা নিয়ে নতুন করে বড় প্রশ্ন উঠেছে। ঘটনার তদন্তে জানা গেছে, ২০২৪ সালে একটি ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে আইনজীবী সমর্থ সিংহের সঙ্গে টুইশার পরিচয় হয় এবং পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তারা পারিবারিকভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

টুইশার মৃত্যুর পর গত পাঁচ দিন ধরে তার মরদেহ ভোপাল এইমস-এর মর্গে পড়ে রয়েছে এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে তার পরিবার মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদবের বাসভবনের সামনে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন।

টুইশার বাবা নবনিধি শর্মা এবং তুতো ভাই আশীষ শর্মা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ভোপালে পৌঁছানোর পর থেকেই তারা চরম হেনস্থার শিকার হচ্ছেন এবং পুলিশ মামলা নথিভুক্ত করতে গড়িমসি করছে। প্রাথমিক ময়নাতদন্তের সংক্ষিপ্ত রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘ঝুলে থাকার’ কথা বলা হলেও টুইশার শরীরে একাধিক গভীর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা দেখে পরিবারের দাবি এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

এই ঘটনায় ভোপালের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক গিরিবালা সিংহ এবং তার ছেলে তথা টুইশার স্বামী সমর্থ সিংহের বিরুদ্ধে যৌতুকের জন্য নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ এনেছে নিহতের পরিবার।

অভিযুক্তদের প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে স্থানীয় পুলিশি তদন্ত প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে একটি বিশেষ তদন্ত দল (সিআইটি) গঠন করা হয়েছে।

এদিকে, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিরপেক্ষভাবে উদঘাটনের দাবিতে নিহতের পরিবার কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছে দিল্লির এইমস হাসপাতালে পুনরায় ময়নাতদন্তের জোর দাবি জানিয়েছে।

সূত্র:  এনডিটিভি

 

এসি//

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন #বিয়ে #রহস্যজনক মৃত্যু #টুইশা শর্মা #ভারত